খবর

বৃহস্পতিবার | ২৩ নভেম্বর, ২০১৭ | ৯ অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ | ৪ রবিউল-আউয়াল, ১৪৩৯

প্রচ্ছদ » খবর » মাওয়া ও দৌলদিয়া ঘাটে এখন শুধু আতঙ্ক আর দুর্ভোগ

মাওয়া ও দৌলদিয়া ঘাটে এখন শুধু আতঙ্ক আর দুর্ভোগ

মাওয়া ও দৌলদিয়া ঘাটে এখন শুধু আতঙ্ক আর দুর্ভোগ

পদ্মার রুদ্রমূর্তির কারণে গুরুত্বপূর্ণ মাওয়া-কাওড়াকান্দি ও দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথ এখন আতঙ্ক ও দুর্ভোগের পথে পরিণত হয়েছে।

প্রচণ্ড স্রোতের কারণে উভয় নৌপথে স্বাভাবিকভাবে ফেরি চলাচল করতে পারছে না। আবার নদীভাঙনে মাওয়া ও দৌলতদিয়া ঘাট পদ্মাগর্ভে বিলীন হয়ে যেকোনো মুহূর্তে ফেরি ও লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পদ্মা ও যমুনায় পানি বৃদ্ধির ফলে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথে সাময়িক নাব্যতাসংকট কেটেছে। শুরু হয়েছে ফেরি চলাচলও। তবে ফেরিস্বল্পতায় এ নৌপথের উভয় ঘাটে শত শত পণ্যবাহী ট্রাক ও বাস আটকে পড়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, মাওয়া-কাওড়াকান্দির উভয় ঘাটে সারি সারি পণ্যবাহী ট্রাক ও যাত্রীবাহী বাস পারাপারের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। তীব্র স্রোতে ঝুঁকি নিয়ে মঙ্গলবার রাত থেকে ১৫টি ফেরির মধ্যে মাত্র চারটি চলাচল করছে। এ চারটি ফেরি স্রোতের অনুকূলে মাওয়া ঘাট থেকে ছেড়ে সহজে কাওড়াকান্দি যেতে পারছে। কিন্তু স্রোতের প্রতিকূলে কাওড়াকান্দি থেকে মাওয়ায় আসতে চার-পাঁচ ঘণ্টা লাগছে। মঙ্গলবার বিকেলে কাওড়াকান্দি থেকে টাপলু নামের একটি ফেরি ২৬টি ছোট-বড় যান নিয়ে মাওয়া আসার পথে স্রোতের তোড়ে ভেসে গিয়ে লৌহজং টার্নিং পয়েন্টে চরে আটকা পড়ে। গতকাল বুধবার সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত ফেরিটিকে উদ্ধার করা যায়নি।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) ও ঘাট সূত্রে জানা গেছে, অস্বাভাবিক পানি বাড়ায় মাওয়ায় প্রচণ্ড স্রোত দেখা দিয়েছে। এ কারণে মঙ্গলবার বিকেল থেকে মাওয়া-কাওড়াকান্দি নৌপথে ফেরি চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। ফেরি টাপলু দীর্ঘ সময় চেষ্টা করেও মাওয়া ঘাটে ভিড়তে পারেনি। স্রোতের তোড়ে ভেসে গিয়ে চরে আটকা পড়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, স্রোতের কারণে ফেরি বীরশ্রেষ্ঠ মো. রুহুল আমিন ও কনকচাঁপা ছাড়া সব ফেরি নোঙর করা। এ দুটি ফেরি কাওড়াকান্দি থেকে যানবাহন নিয়ে কোনোরকম মাওয়া ঘাটে আসছে। ফেরি চলাচল ব্যাহত হওয়ায় দুই ঘাটে আটকে থাকা যানবাহনের যাত্রীদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ কাওড়াকান্দি ঘাটের (বিআইডব্লিউটিএ) ব্যবস্থাপক এম সালাম জানান, শাহ মখদুম ফেরিটি মঙ্গলবার বিকেল পাঁচটায় এবং খানজাহান আলী সাড়ে পাঁচটায় যানবাহন নিয়ে কাওড়াকান্দি ঘাট থেকে মাওয়ার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। কিন্তু মাওয়া পাড়ে তীব্র স্রোতের কারণে ফেরি দুটি রাত সাড়ে নয়টা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি।

বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান সামছুদ্দোহা খন্দকার সাংবাদিকদের বলেন, আগামী ঈদের আগে মাওয়া ঘাটে পদ্মার ভাঙন ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। ঘাট ভেঙে গেলে দ্রুত যাতে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া যায়, সে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, মাওয়া চৌরাস্তা থেকে মহাসড়কের খানবাড়ী পর্যন্ত দুই কিলোমিটার ও শ্রীনগরের ছনবাড়ী থেকে ষোলোঘর পর্যন্ত আরও দুই কিলোমিটার পর্যন্ত পণ্যবাহী শত শত ট্রাক ও অন্যান্য যান আটকা পড়ে আছে।

ট্রাকচালক মো. বাবুল আহমেদ বলেন, ‘তিন দিন ধরে এখানে (মাওয়া চৌরাস্তায়) আটকা পড়ে আছি। চলছেই কয়েকটি ফেরি।’ তিনি অভিযোগ করেন, যাঁরা পুলিশকে টাকা দিতে পারছেন, তাঁরা সিরিয়াল অমান্য করেই আগে চলে যাচ্ছেন।

ঈদুল ফিতরের পর থেকে উপজেলার দৌলতদিয়া ইউনিয়নের বাহিরচর দৌলতদিয়া, নোহারী মণ্ডলপাড়া, ইসাঈল শিবরামপুর, নতুন পাড়া ও ঢল্লাপাড়া, দেবগ্রাম ইউনিয়নের বাঘাবাড়ী, বেথুরী, সাজাপুর, চর দেলন্দি ও দেবগ্রাম এবং ছোট ভাকলা ইউনিয়নের বড় জলো, ছোট জলো ও চর বরাট এলাকার অধিকাংশ গ্রাম পদ্মায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। ভাঙনকবলিত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকায় শিগগিরই নদীতীর সংরক্ষণে ব্যবস্থা না নিলে আরও কয়েক হাজার পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাবে। এমনকি দৌলতদিয়া ঘাটসহ জাতীয় মহাসড়কও হুমকিতে পড়তে পারে।

ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করেন রাজবাড়ী-১ আসনের সাংসদ কাজী কেরামত আলী। এ সময় তাঁর সঙ্গে থাকা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল আউয়াল মিয়া বলেন, কর্তৃপক্ষকে পরিস্থিতি জানানো হয়েছে। নদীতীর সংরক্ষণের কাজ আগামী অর্থবছরে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ জন্য আনুমানিক ১৪০ থেকে ১৫০ কোটি টাকা লাগবে।

এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় ভাগ্যকুল গোয়ালন্দ পয়েন্টে ১৫ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়ে তা বিপৎসীমার ১৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পদ্মা-যমুনায় পানি বৃদ্ধির ফলে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথে নাব্যতা অনেকটা ফিরে এসেছে। ফলে সাময়িকভাবে ফেরি চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে। কিন্তু তীব্র স্রোতে ফেরি চলাচল কমে যাওয়ায় গতকাল বিকেল পর্যন্ত উভয় ঘাটে আট শতাধিক গাড়ি পারাপারের অপেক্ষায় ছিল।

বিআইডব্লিউটিএর খনন বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আইয়ুব আলী বলেন, দৌলতদিয়া চ্যানেলে কয়েক দফা চেষ্টা করেও বিকল্প পদ্ধতিতে খনন করা সম্ভব হয়নি। এখন দৌলতদিয়ার আপ চ্যানেলে স্রোতের গতিবেগ ঘণ্টায় ৫ দশমিক ৫ নটিক্যাল মাইল। এ স্রোতে খননযন্ত্র বসিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান মো. শামছুদ্দোহাসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নৌপথটি পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের বলেন, ঈদের আগে ফেরি চলাচল স্বাভাবিক রাখতে বিকল্প পদ্ধতিতে চ্যানেল খনন করে ঘাট চালু রাখা হবে। এ লক্ষ্যে তিনি জরুরি ভিত্তিতে বিকল্প পদ্ধতিতে পরীক্ষামূলক খনন শুরুর নির্দেশ দেন।

বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়া কার্যালয়ের সহকারী ব্যবস্থাপক আবু আবদুল্লাহ বলেন, ঘাটে অপেক্ষমাণ গাড়ির পারাপারে এ মুহূর্তে কমপক্ষে আরও তিন-চারটি রো রো ফেরি দরকার। পাটুরিয়া কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক শফিকুল ইসলাম জানান, ‘পাঁচটি রো রো ফেরির মধ্যে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান গতকাল (বুধবার) বিকেল থেকে বসে আছে। বাকি চারটি রো রো ও পাঁচটি কে টাইপ ফেরি দিয়ে যানবাহন পারাপার করা হচ্ছে। মাওয়া ঘাট বন্ধ হলে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ঘাটে যানবাহনের চাপ অনেক বেড়ে যাবে। দ্রুত এই নৌপথে রো রো ফেরি বাড়ানো দরকার।

 

বিসিসি নিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

মন্তব্য করুন