অর্থনীতি

শনিবার | ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ | ২ পৌষ, ১৪২৪ | ২৭ রবিউল-আউয়াল, ১৪৩৯

প্রচ্ছদ » অর্থ ও বাণিজ্য » অর্থনীতি » গ্রামীণ ব্যাংক বিল সংসদে

গ্রামীণ ব্যাংক বিল সংসদে

গ্রামীণ ব্যাংক বিল সংসদে

৩ অক্টোবর মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর রোববার গ্রামীন ব্যাংক বিল ২০১৩ সংসদে উত্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

ব্যাংকের নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরকারের পরামর্শ নেওয়া বাধ্যতামূলক, সরকার কর্তৃক চেয়ারম্যান নিয়োগ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদনে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগের বিধানের প্রস্তাব করে গ্রামীণ ব্যাংক আইন-২০১৩ নামে একটি বিল গতকাল সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে।সরকার সরাসরি অথবা গেজেট প্রজ্ঞাপনের দ্বারা ব্যাংক কোম্পানি আইনসহ ব্যাংক কোম্পানিসংক্রান্ত অন্যান্য আইনের সুনির্দিষ্ট বিধানসমূহ গ্রামীণ ব্যাংকের ওপর প্রযোজ্য করতে পারবে এবং এই ব্যাংকের জন্য বিধি প্রণয়ন করতে পারবে মর্মে বিধানও রাখা হয়েছে আইনে। এছাড়াও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে আর্থিক হিসাব দেওয়ার বাধ্যবাধকতা, অনুমোদিত ও পরিশোধিত মূলধন বৃদ্ধি, ব্যাংকে সরকারের শেয়ার ২৫% নির্ধারণ, সরকার কর্তৃক তিনজন পরিচালক নিয়োগ প্রদান, সদস্যদের মেয়াদকাল নির্ধারণ, বোর্ড সভার কোরাম পূরণের শর্ত তিনজন করাসহ বেশ কিছু নতুন বিধান ও সংশোধনী আনা হয়েছে প্রস্তাবিত আইনে।

মূলত গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ-১৯৮৩ রহিত করে ব্যাংকের ওপর সরকারের অনেকটা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিধান করে বিলটি আনা হলো।

আইনটির বিধান অনুযায়ী প্রামীণ ব্যাংককে তার সব কার্যক্রমের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। বার্ষিক আর্থিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনও জমা দিতে হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে।

আইনের ধারা-৩(২)-এ বলা হয়েছে- সরকার, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, ব্যাংক কোম্পানি আইন-১৯৯১ এবং ব্যাংক কোম্পানিসংক্রান্ত আপাতত বলবৎ অন্য কোনও আইনের সুনির্দিষ্ট বিধানসমূহ এ ব্যাংকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য করতে পারবে।

ধারা-৪(১)-এ বলা হয়েছে- গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ ১৯৮৩-র অধীনে প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক এমনভাবে বহাল থাকিবে যেন উহা এই আইনের অধীন প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে।

আইনের ৬ ধারায় অনুমোদিত মূলধন ১ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করার পাশাপাশি বলা হয়েছে- ব্যাংক ইহার অনুমোদিত মূলধন সরকারের পূর্বানুমতিক্রমে সময় সময় বৃদ্ধি করতে পারবে।

ধারা-৭-এ পরিশোধিত মূলধন ৩০০ কোটি টাকায় বৃদ্ধি করে সরকারের জন্য ২৫ এবং ৭৫ ভাগ শেয়ারহোল্ডারদের (ঋণগ্রহীতা) জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

ধারা ৮(২)-এ বলা হয়েছে- ব্যাংক উহার কার্যাদি সম্পাদনে জনস্বার্থের প্রতি যথাযথ গুরুত্ব প্রদান করিয়া সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিবে; তবে শর্ত থাকে যে, সরকারের সহিত পরামর্শক্রমে ব্যাংক সকল নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিবে।

ধারা-৯-এ বোর্ড গঠনে পরিচালকের সংখ্যার ব্যাপারে বলা হয়েছে- সরকার কর্তৃক নিযুক্ত তিনজন ব্যক্তি ও বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে ঋণ গ্রহীতা-শেয়ারহোল্ডারগণ কর্তৃক নির্বাচিত ৯ জন ব্যক্তির সমন্বয়ে বোর্ড গঠিত হবে। ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদাধিকার বলে বোর্ডের পরিচালক হবেন কিন্তু তার কোনও ভোটাধিকার থাকবে না।

ধারা-৯(১)-এ চেয়ারম্যান নিয়োগের ব্যাপারে বলা হয়েছে- বোর্ডের একজন চেয়ারম্যান থাকিবেন যিনি সরকার নিযুক্ত পরিচালকগণের মধ্য হইতে সরকার কর্তৃক নিযুক্ত হইবেন।

ধারা ১১(১)-এ পরিচালকদের মেয়াদের ব্যাপারে বলা হয়েছে- নির্বাচিত পরিচালকদের কার্যকাল হইবে প্রতি মেয়াদে সর্বোচ্চ তিন বছর।

(২)এ বলা হয়েছে- সরকার কর্তৃক নিযুক্ত পরিচালকগণ তাদের নিজ নিজ পদে সরকারের সন্তুষ্টি অনুযায়ী প্রতি মেয়াদে সর্বোচ্চ তিন বছর বহাল থাকিবেন। তবে শর্ত থাকে যে, কোনও ব্যাংক-কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা যে নামেই অভিহীত হউক না কেন, ব্যতিত অন্য কোনও পরিচালক একাদিক্রমে দুই মেয়াদের অধিক উক্ত পদে অধিষ্ঠিত থাকিতে পারিবেন না।

(৩)-এ বলা হয়েছে- উপধারা (১) অনুসারে কোনও পরিচালক একাদিক্রমে ২ মেয়াদে পরিচালক পদে অধিষ্ঠিত থাকিলে দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হইবার তারিখ হইতে পরবর্তী ৩ বৎসর অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত উক্ত বাংকের পরিচালক পদে পুন:নির্বাচিত হইবার যোগ্য হইবেন না।

ধারা-১৪-এ ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের ব্যাপারে বলা হয়েছে- (১) ব্যাংকের একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকিবেন যিনি উপধারা (২)(৩)-এর বিধান অনুসারে বাছাইকৃত কমিটির সুপারিশকৃত তিনজন প্রার্থীর প্যানেল হইতে বোর্ড কর্তৃক বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদনক্রমে নিযুক্ত হইবেন।

(২) ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের জন্য প্রার্থী বাছাইয়ের উদ্দেশে চেয়ারম্যান, বোর্ডের সহিত পরামর্শক্রমে অনূ্যন ৩ জন এবং অনধিক ৫ জন সদস্য সমন্বয়ে একটি বাছাই কমিটি গঠন করিবেন।

(৩) ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের জন্য বাছাই কমিটি ৩ জন প্রার্থীর একটি প্যানেল সুপারিশ করিবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি, অর্থনীতি বা ক্ষুদ্র অর্থায়নের ক্ষেত্রে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিগণকে অগ্রাধিকার প্রদান করা হইবে।

(৪) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্যাংকের সার্বক্ষণিক কর্মকর্তা ও প্রধান নির্বাহী হইবেন এবং তিনি বিধি দ্বারা নির্ধারিত অন্যান্য শর্তাধীনে অনধিক ৬০ বৎসর বয়স পর্যন্ত চাকুরীতে বহাল থাকিবেন।

উপধরা (৫)-এ বলা হয়েছে- ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ শূন্য হলে নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনক্রমে, বোর্ড কর্তৃক মনোনীত ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কোনও কর্মকর্তা ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করবেন।

ধারা-১৬(২)-এ বোর্ডের সভার কোরামের সদস্য সংখ্যা আগের ৪ জনের স্থলে তিনজন করা হয়েছে। এই ধারার উপধারা (২)-এ বলা হয়েছে- উপধারা(২) যাহা থাকুক না কেন, নির্বাচিত পরিচালকদের পদ শূন্য হইলে বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে পরিচালক নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত চেয়ারম্যান এবং সরকার কর্তৃক নিযূক্ত অপর ২ জন পরিচালকের উপস্থিতিতে সভার কোরাম হবে।

ধারা ২২-এ হিসাবের ব্যাপারে বলা হয়েছে- ব্যাংক বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুত করিবে এবং আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুতকালে দেশে প্রচলিত বিধি বিধান ও হিসাবমান এবং বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক এতদুদ্দেশ্যে নির্দেশিত হিসাবমান পরিপালন করিবে।

ধারা-২৪-এ রিটার্ন, প্রতিবেদন ও বিবরণী বিষয়ে সরকারের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে পেশ করার বিধান করা হয়েছে।

আইনে মিথ্যা বিবরণ, প্রসপেক্টাস বা বিজ্ঞাপনে ব্যাংকের নাম ব্যবহারের জন্য অর্থদণ্ড ও কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

প্রস্তাবিত আইনের ৩২ ধারায় আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪ অধীনে আয়ের ওপর প্রদেয় আয়কর থেকে সরকার কর্তৃক অব্যাহতির বিধান রাখা হয়েছে।

৩৪ ধারায় সরকারকে বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা দিয়ে বলা হয়েছে- সরকার, সরকারি গেজেট প্রজ্ঞাপন দ্বারা এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে বিধি প্রণয়ন করিতে পারিবে।

আইনের উদ্দেশ্য ও কারণসংবলিত বিবৃতিতে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, সামরিক শাসন আমলে জারিকৃত সকল অধ্যাদেশ সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক বাতিল ঘোষিত হওয়ায় এবং পরবর্তীতে অনুরূপ বাতিলকৃত অধ্যাদেশ হাল নাগাদকরণ পূর্বক বাংলা ভাষায় আইন প্রণয়নসংক্রান্ত মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুসারে গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ ১৯৮৩ রহিত করে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সংশোধন ও পরিমার্জনক্রমে যুগোপযোগী করার জন্য বাংলা ভাষায় গ্রামীণ ব্যাংক আইন-২০১৩ প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, গ্রামীণ ভূমিহীন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর নিকট গ্রামীণ ব্যাংকের সেবামূলক কার্যক্রমের মধ্যে ঋণ বিতরণ ও অন্যান্য সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশের অধীনে গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়। গ্রামাঞ্চলে বসবাসরত ব্যাপক জনগোষ্ঠীর নিকট গ্রামীণ ব্যাংকের সেবামূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণ, উক্ত ব্যাংকে সরকার নিয়ন্ত্রিত সংস্থার মালিকানা বহাল রেখে ঋণ গ্রহীতা সদস্যগণের শেয়ার মালিকানা অর্জনের সুযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে এ আইন প্রণয়ন করা হয়েছে।

 

বিসিসি নিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

মন্তব্য করুন