সম্পাদকীয়

বৃহস্পতিবার | ১৯ অক্টোবর, ২০১৭ | ৪ কার্তিক, ১৪২৪ | ২৮ মহররম, ১৪৩৯

প্রচ্ছদ » মতামত » সম্পাদকীয় » নূর হোসেন বনাম মনির হোসেন

নূর হোসেন বনাম মনির হোসেন

নূর হোসেন বনাম মনির হোসেন

কার আত্নত্যাগ তাৎপর্যমন্ডিত? এ প্রশ্ন আজ বাঙ্গালী জাতির সামনে। আমাদের গণতন্ত্রের লড়াই বার বার মুখ থুবরে পড়ছে। আবার নূর হোসেন, বাবুল, টিটোর মত হাজারো মনির বুলেটে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে কিংবা কেরোসিনের আগুনে ঝলসে মারা পড়ছে। জাতি আজ কার আত্নত্যাগ মহিমান্বিত করে দেখবে? নূর হোসেনের আত্নত্যাগ তো স্বীকৃতি পেয়েছিল স্বৈরাচার আন্দোলনের পতন ঘটিয়ে গণতন্ত্রের যাত্রাকে পূনরুদ্ধারের মাধ্যমে। ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের এক লড়াকু সৈনিক হিসেবে রাজপথে নেমে এসেছিলেন বুকে পিঠে ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক, স্বৈরাচার নিপাত যাক’ স্লোগান লিখে।

স্বৈরাচারের বুলেট নূর হোসেনের জীবন কেড়ে নিলেও জাতিকে স্বৈরাচারের কলঙ্কিত ইতিহাস থেকে মুক্ত করেছিল তার আত্নত্যাগ। কেননা তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন বেগবান হয়ে উঠেছিল। দেশের আপামর জনতা এক হতে পেরেছিল। তাই মুক্ত হয়েছিল গণতন্ত্র।

কিন্তু ভ্যানগাড়ী চালক বাবার সন্তান ছিল মনির। স্বপ্ন জাগল মনে বিভৎস শহর ঢাকা দেখার। বাবার ভ্যানে করে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত পৌছেছিল। ততক্ষণে ১২ বছরের মনিরের চোখে ঘুম চলে আসে। ঘুমন্ত মনিরের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দিয়ে ত্রাস সৃষ্টির উন্মাদনায় মেতে উঠল গণতন্ত্রের যাত্রাকে অব্যহত করার তাগিদে। সে লক্ষ্যে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো তাদের কর্মীদেরকে ঝাঁপিয়ে পড়তে বলল ঘুমন্ত শিশু মনিরের উপর। আর মনির স্বীকার হল প্রথম ৬০ ঘন্টা হরতালের ত্রাস সৃষ্টির উপকরণ হিসেবে।

Nur Hossain

তবে মনিরের মত প্রাণ দিতে হয়েছে অনেক মনিরকে গত কয়েকদিনের হরতালে। তাদের এই আত্নত্যাগের অর্জন কি? যে আত্নত্যাগের পিছনে কোন উদ্দেশ্য নেই তাকে কি আত্নত্যাগ বলা যায়? নাকি হত্যা?

নূর হোসেন জীবন দিয়েছিল গণতন্ত্রকে উদ্বারের লক্ষ্যে। কিন্তু মনিরকে ঘুমন্ত অবস্থায় জীবন উৎসর্গ করতে বাধ্য করেছে আমাদের দেশের গণতন্ত্রকামী দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল ও তার অস্ত্রধারী কর্মীরা। যারা বিশ্বাস করে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডই পারে জনগণের মনে ত্রাস সৃষ্টি করে গণতন্ত্রকে উদ্ধার করতে। তাই আবারও ৭২ ঘন্টার হরতালের আহ্বান করা হয়েছে। এবং প্রস্তুতি চলছে, আর কোনো মনিরদের ঘুমন্ত অবস্থায় আগুনে পুড়িয়ে মারা যায় কিনা। হরতাল সমর্থনকারী যে দলই হোক না কেন, দেশের প্রতিটি সচেতন জনগণের উচিত প্রতিবাদ জানানো। এবং আরো প্রতিবাদ জানানো উচিত হরতালের নামে নৃশংস হত্যাকান্ডেরও। কেননা এই হত্যাকান্ডের সাথে রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের অস্ত্র হিসেবে হরতালকে ব্যবহার করার বৈধতা হারিয়েছে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো। হরতাল এখন আর প্রতিবাদের ভাষা নয়, হত্যাকান্ডের ভাষা।

Monir

আর একটি ৯০’এর অভ্যুত্থান প্রয়োজন, হরতালের নামে সরকারী দলের ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রস্তুতির প্রেক্ষাপটে যে সহিংসতা ঘটে চলছে তার প্রতিবাদ জানাতে। সরকার বা বিরোধী দল কারোরই অধিকার নেই ক্ষমতার দ্বন্দ মেটাতে ২০০ গাড়ি পোড়ানোর। কারণ এই গাড়িগুলো ক্রয় করা হয়নি বঙ্গবন্ধুর টাকায় কিংবা জিয়াউর রহমানের টাকায়। এই গাড়ীগুলো ক্রয় করা হয়েছে এদেশের ষোল কোটি জনগণের কষ্টার্জিত টাকায়। দু’দলের ক্ষমতার লড়াইয়ের দ্বন্দে কোন দলেরই অধিকার নেই প্রতিদিন হরতাল ডেকে শত শত গাড়ি পোড়ানো বা ভাংচুর করা। গতদিন রাতে হরতালে পোড়ানো একটি গাড়ির দেহ কেবলই মনে করিয়ে দিচ্ছিল, আমাদের রাজনীতি এখন ঐ পুড়ে যাওয়া গাড়ীর মতই ভষ্মিভূত হয়ে গেছে হয়ত। তাই আজ আর কেউ বিবেচনা করতে রাজি না “নূর হোসেন না মনির হোসেন” কার আত্নত্যাগ সফল হবে। আজ তাহলে কি নূর হোসেন কবরে বসে ভাবছে, আমাকে আরেকবার জন্ম নিতে হবে দেশের এই অন্যায় অত্যাচারের বিরোদ্ধে রুখে দাড়াতে!!!

 

বিসিসি নিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

মন্তব্য করুন