সাহিত্য জগৎ

বৃহস্পতিবার | ২৩ নভেম্বর, ২০১৭ | ৯ অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ | ৩ রবিউল-আউয়াল, ১৪৩৯

প্রচ্ছদ » সাহিত্য জগৎ » ছোটগল্প – সন্তান

ছোটগল্প – সন্তান

ছোটগল্প – সন্তান

০১।

স্বপচারী, স্বপ্নবিলাসি, স্বপ্নের মধ্যেই বাস

দীর্ঘ দিবস রজনী পার করে

ভালবাসার তপ্ত রোদে

কঠোর হাতে, স্বপ্ন বুনে।

নানারকম স্বপ্নের জাল ছিঁড়ে। আবার-জাল বুনে। যে জালের কঠিন বেড়াজালে আটকা পড়ে ইয়াছমিন। মাঝে মাঝে তীব্র ব্যথায় কুঁকড়ে ওঠে। বুকের গহীনে লুকানো কান্না আনন্দধারা হয়ে ঝরে পড়ে। সে কান্না ভেতর থেকে আসলেও তা হয় ক্ষণস্থায়ী। দীর্ঘস্থায়ী হয় শুধু একটা জিনিস, আনন্দ। যে আনন্দের সীমা-পরিসীমা নেই। অন্ধকার কেটে আলোর ঝলকানিতে মুখরিত সারাবাড়ি, সারাঘর।

আকাশে অজস্র তারার মিতালী, চাঁদের সাথে লুকোচুরি খেলা সবই যেন বিমোহিত করে ইয়াছমিনকে। সে খেলায় ব্যথা পেলেও হাসি মুখে তাকে বরণ করে।

ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে ভ্রুণ। বাড়তে থাকে ব্যস্ততা। একটু আঘাতেই চমকে ওঠে। আর এই চমকানোই তার কাছে হয় অতৃপ্ত আনন্দের বন্যা। ইয়াছমিনের হাজব্যান্ড ফারুকের বাড়ে ব্যস্ততা। জারি হয় ইয়াছমিনের উপর ১৪৪ ধারা। নানা নিয়ম কানুনের শৃঙ্খলে আটকা পড়ে ইয়াছমিন। তবু তার আনন্দের শেষ নেই। অতিথির আগমনকে সাধুবাদ জানাতে তৈরি হয় নানা স্বপ্ন লিপি। রঙ্গিন সুতোয় গাঁথা হয় নানা রঙ্গের কাঁথা। সে কাঁথা জুড়ে ওঠে নানা মেঘবালিকার ছবি। যে বালিকা মেঘের ভেলায় চড়ে উড়ে বেড়ায় সাত সাগর তেরো নদী। যার সাথে খেলা করে আকাশের রুপালি চাঁদ। অতৃপ্ত বাসনাগুলো নিমিষেই স্বপ্ন চূড়ায় পৌছায়। যেখানে বসত করে স্বর্গ রাজ্যের বাসিন্দা আর বেড়ে ওঠা ভ্রুণ। দু’জনের খুব ভাব।

ইয়াছমিনের মুখে আনন্দের ঝিলিক। সারাদিন তার একটা ঘোরের ভেতর কাটে। এই ঘোর তার ভালোলাগাকে নিয়ে যায় বহুদূর।

আজ ফারুক অফিস থেকে ফেরার পথে অনেক কিছু নিয়ে আসে। যা কিনা সবই তাদের স্বর্গ রাজ্যের বাসিন্দার জন্য। ইয়াছমিন ফারুকের কান্ড কারখানা দেখে ভীষণ খুশি। ফারুক জিনিসগুলো নিয়ে দারুণ ব্যস্ত। ফারুক লুকোচুরি করে তার দিকে তাকায় আর হাসে। ফারুকের বিন্দু মাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। সে মহা ব্যস্ত।

অতিথির নাম প্রতিদিনই পরিবর্তন হয়। এই নাম ভালো, না এই নাম ভালো। না না এটা খুব সুন্দর। আরে না এই নাম সুন্দর। এই নিয়ে ঘুমাতে যাওয়ার আগে হয় কঠিন ঝগড়া। আজ ও তার ব্যতিক্রম নয়।

আচ্ছা, তুমি নাম নিয়ে এতো ব্যস্ত হলে কেন?

ইয়াছমিনের মুখে উত্তেজনা।

আমি যেটা বলেছি সেটাই হবে।

না,আমারটা সুন্দর।

আমারটা।

আমি বলছি আমারটা।

ফারুক চুপ হয়ে যায়। লুকিয়ে লুকিয়ে হাসে। ইয়াছমিনকে রাগাতে তার ভালোই লাগে। আসলে ইয়াছমিনের দেয়া নামটাই সুন্দর, কাব্য। ইয়াছমিনের চোখে জল টলমল। মনে হয় এক্ষুণি বৃষ্টি নামবে। তবে সে বৃষ্টি টিপটিপ করে নয় দমকা বাতাস নিয়ে হবে তার আগমন। এই বৃষ্টিকে সাধুবাদ জানানোর চাইতে কেটে পড়াই ভালো। এক্ষুণি শুরু হলো সাপের মত ফোঁস ফোঁস শব্দ। কতক্ষণ যে চলবে তা একমাত্র বিধাতাই জানে। ফারুক কেটে পড়ে। সফেদ দেয়ালে ঝোলানো রয়েছে অনেকগুলো মেঘবালক আর মেঘবালিকার ছবি। ফারুক তাদের দেখছে আর মিটিমিটি হাসছে, কথা বলছে।

একটা মেয়ে হবে। ফুটফুটে মেয়ে। যে মেয়ের কচি মুখে থাকবে স্বর্গের আভাস। বুকের মাঝে লেপ্টে থাকবে সারা সকাল, বিকাল, রাত। কিছুক্ষণ পর কেঁদে উঠবে।

না না কাঁদেনা বাবা। লক্ষ্ণীসোনা কাঁদেনা। তোমাকে নিয়ে যাবো স্বপ্নের দেশে। খোকন সোনা, চাঁদের কণা, বাজায় সে সুরের বীনা, বুকের মাঝে হয়েছে তাই স্বপ্নের বীজ বোনা।

ফারুক চায় তাদের মেয়ে হবে। আর ইয়াছমিন চায় ছেলে। এনিয়ে দু’জনের প্রায় ঝগড়া হয়। তবে এই ঝগড়া দীর্ঘস্থায়ী নয়। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ বৃষ্টি থেমে যাওয়ার মত থেমে যায়। বিধাতার উপর ছেড়ে দেয় দু’জন। ফারুকের পছন্দের নাম সুস্মিতা। আর ইয়াছমিনের পছন্দের নাম কাব্য। একটা অদ্ভূত মিল রয়েছে দু’জনের, সেটা যাই হোক স্বপ্ন লিপি। কে বেশী সুন্দর?

কাব্য না সুস্মিতা। সুস্মিতা সুন্দর। বাবা বাবা বলে বুক ভাসাবে অথই জলে। সেই জলে স্নান করে আমি শুভ্র হবো। মা, মা বলে তার গালে এঁকে দেবো স্বর্গের পরশ।

বাবা আমাকে স্কুলে নিয়ে যাবে না?

আমি কি বলেছি?

আমি মায়ের সাথে যাবো না। মা খুব পঁচা। আমাকে একদম আদর করেনা।

ছিঃ মা। মা সম্পর্কে এমন মন্তব্য করা উচিত নয়।

মা যা আমি তাই বলেছি।

ঠিক আছে আমিই নিয়ে যাবো। এবার খুঁশিতো?

হ্যাঁ। অনেক খুঁশি।

আমি আইসক্রিম খাবো।

দেবো। সব দেবো। আমার সোণা চাঁদমণিকে দেবো না কাকে দেবো।

ইয়াছমিনের হাত ফারুকের কাঁধে পড়ে। ফারুক চমকে ওঠে।

তুমি কি দেবো দেবো করছ?

কই নাতো। কিছু না।

বললেই হলো। তুমি কার সাথে যেনো কথা বলছিলে।

আমার মেয়ে সুস্মিতার সাথে।

তাই নাকি জনাব।

হ্যাঁ। ও বলেছে তুমি খুব পঁচা।

ইয়াছমিনের চোখ লাল হতে থাকে। মনে হলো একদম বোম্বাই মরিচ। কিছু একটা ভাবছে।

মা, বাবা খুব বাজে। তুমি খুব ভালো। তোমার মত কেন বাবা হতে পারে না?

সব মানুষতো আর এক হয় না।

কেন মা?

সেটা একমাত্র উপরওয়ালা জানেন।

উনি কে?

আমাদের সৃষ্টি কর্তা, পালন কর্তা, রিযিক দাতা।

উনি কি অনেক উপরে থাকেন?

হ্যাঁ।

তুমি কখনো দেখেছ?

না। তবে শুনেছি। উনি খুব ভালো। মন থেকে ওনাকে দেখতে চাইলে আর ওনার কথা মত চলতে পারলে উনি খুব খুশি হন।

আর খুশি হয়ে তার সাথে দেখা দেন।

আমার সাথে দেখা দেবেন?

জানিনা। চলো, স্কুলের দেরি হয়ে যাচ্ছে।

চলো।

ইয়াছমিন চুপ করে আছে। তার মুখে হাসির ঝিলিক। ফারুক তার গালে টোকা দেয়। ইয়াছমিন নিরুত্তর। চোখের সামনে হাত ঘোরায়। নির্বাক।

চুপ কেন ম্যাডাম?

ইয়াছমিন ফারুকের কথায় চমকে ওঠে। চোখ তার আবার লাল হয়ে ওঠে। আমার কাব্য বলেছে ‘তুমি খুব বাজে।’

তাই নাকি ম্যাডাম। ঠিক আছে আপনিই ঠিক। চলুন কিছু খেয়ে নিই।

ইয়াছমিন হাসে। ওর হাসি ফারুককে মুগ্ধ করে। ফারুক তার লাজুক মাখা হাসি দেখে। ওকে খুব সুন্দর লাগছে। এই হাসি যেন কোন দিন ম্লান না হয়।

চলো।

০২।

আজ সাত মাস পূর্ণ হলো। ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। আরেকবার চেকআপ করে আসলে নিশ্চিত হওয়া যাবে। হাটি হাটি পা পা করে বড় হচ্ছে সোনামণি। ও দেখতে অনেক সুন্দর হবে। একদম রাজপুত্র। পঙ্খীরাজ ঘোঁড়ায় চড়ে আমাকে নিয়ে যাবে রাজপুরিতে। সিংহাসনে বসবে সেই রাজপুত্র। তার পাশে সোনার চেয়ারে আমি। ও আমার পা ছুঁয়ে সালাম করবে। আমি তাকে আশির্বাদের হাত বাড়িয়ে আদর করে দেবো। সেই রাজ্যে একনামে কাব্যকে সবাই সমীহ করবে। কাব্য তুমি অনেক বড় হও। তোমার কাজে দীপ্ত হোক এই রাজ্য, এই দেশ, এই ভুবন।

ইয়াছমিন তার পেটে হাত বুলায়। বাচ্চা নড়ছে। ইয়াছমিন দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে!

আমার সোনামানিক। তুমি অনেক বড় হও, অনেক বড়।

ফারুক দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকায়। ৯.৩০ মিনিট। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়ায়। কোর্ট, টাই ঠিক করে।

ইয়াছমিন, ইয়াছমিন।

কি হয়েছে?

আর কতক্ষণ?

এইতো হয়ে গেছে।

ধীরে ধীরে এদিকে এসো।

আচ্ছা।

না না, তোমার আসার দরকার নেই। আমিই আসছি।

ফারুক এগিয়ে যায়। পাজাকোল করে উঠিয়ে নেয় কোলে। ইয়াছমিন হাসে। ফারুকও সুর মেলায়। বাইরে গাড়ি অপেক্ষা করছে। ইয়াছমিনকে স্ব-যতনে গাড়িতে বসায়।

রহিম।

জ্বি স্যার।

চলো।

ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দেয়, গাড়ি চলতে থাকে। রহিমের বাড়ি নোয়াখালী সদর উপজেলার লক্ষ্ণীনারায়ণপুর গ্রামে। রহিম ভালো মানুষগুলোর মধ্যে একজন। তার চার সন্তান। এক ছেলে তিন মেয়ে। বড় মেয়ে রহিমা এবার এইচএসসি দিয়েছে। খুব ভালো ছাত্রী। দ্বিতীয় মেয়ে মরিয়ম পড়ে ক্লাস নাইনে, তৃতীয় মেয়ে পড়ে ক্লাস সিঙ্। সবার ছোট ছেলে রাতুল। ও পড়ে ক্লাস থ্রিতে। মোটামুটি সুখি একটা পরিবার। রহিম স্বল্প আয় করে। কিন্তু তাতে তার কোন দুঃখ নেই।

স্যার।

বলো।

আমরা পৌঁছে গেছি।

ঠিক আছে গেইট খোলো।

রহিম দৌড়ে এসে গেইট খুলে দেয়। ফারুক ইয়াছমিনকে কোলে নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে ডাক্তারের চেম্বারে নিয়ে যায়। ডাক্তার ফাইল দেখছে। মধ্য বয়স্ক। নাম আশ্রাফ আলী। সুঠাম দেহের অধিকারী। চোখে তার বড় ধরনের চশমা। চুল কোকড়ানো। ডাক্তার ফারুকের দিকে তাকায়। তার মুখে হাসি। কেমন আছেন?

ভালো।

শুধু শুধু আপনি নিয়ে আসলেন কেন? ফোন করলেই আমি চলে যেতাম।

আসলে ইচ্ছে করছিল নিজে নিয়ে যাই। তাই……..।

ভালো করেছেন। ভালো লাগছে এই ভেবে যে, আপনি কেয়ারপুল একজন স্বামী। খাবার দাবারে কোন সমস্যা হচ্ছে না তো? কোন অনিয়ম?

না না কোন সমস্যা নেই।

ঠিক আছে আমি চেকআপ করে দেখছি।

ডাক্তার ইয়াছমিনকে চেকআপ করে বললেন, কোন সমস্যা নেই। বাচ্চা ভালো আছে। খাবার দাবারে কোন অনিয়ম করবেন না। সারাদিন বসে থাকবেন না। একটু হাঁটাহাঁটি করবেন। আর ব্যথা উঠলেই আমাকে ফোন দেবেন আমি চলে আসব। ইয়াছমিন তৃপ্তির হাসি হাঁসে। ফারুক খুশি মনে ডাক্তারের কাছ থেকে বিদায় নেয়।

সকল চিন্তার ইতি টানতেই ফারুকের ছুঁটে চলা। তাদের এই ছুঁটে চলা নিয়ে যায় তাদের স্বর্গ রাজ্যে। যেখানে তারা রেখে এসেছে তাদের রাজকন্যা আর রাজপুত্র। আজ তারা অনেক ব্যস্ত। নানা আয়োজনে প্রতিনিয়ত তাদের ব্যস্ত থাকতে হয়। রঙ্গিন রঙ্গিন ডানা মেলে উড়ে বেড়ায় কাব্য আর সুস্মিতা। তারা অপার হয়ে চেয়ে চেয়ে দেখে আর নতুন গানের সুর ভাজে। যে সুরে সুর মেলায় আকাশের ঐ তারা আর রুপালী চাঁদ।

০৩।

বেড়ে ওঠা ভ্রুণটা এখন হাঁটে, কথা বলে, খেলাধুলা করে, চিমটি কাটে। এতে ইয়াছমিনের একটু কষ্ট হয়, তবে এই কষ্ট দীর্ঘস্থায়ী নয়। সে কষ্টকে জয় করতে করে আপ্রাণ চেষ্টা। এই চেষ্টায় সে বিফল হতে চায়না। জয়ী হওয়ার তীব্র বাসনা বুকের মাঝে লালন করে প্রতিনিয়ত। আর প্রতিদিনই গড়া হয় নতুন নতুন কাঁথা আর স্বপ্নলিপি। এর প্রত্যেকটার রং আলাদা। আর মাত্র দুই মাস বাকী। নতুন অতিথি আসবে। কত মজা হবে। প্রতিটা ক্ষণই কাটে তার ঘোরের মধ্যে। এই ঘোরের ভেতর বেসে ওঠে কাব্যর ছবি।

ছেলেটা বড্ড বেশী বাড়াবাড়ি করছে। এতো কান্নার কি আছে? সারাদিন কি কোলে থাকতে হবে? একটু ঘুমালে ক্ষতি কি। কান্না আর কান্না। ও বুঝেছি, তোর আব্বু তোকে মেরেছে?

কাব্যর কান্না বাড়তে থাকে।

ঠিক আছে, তোর আব্বুকে আচ্ছা করে বকে দেবো। কাঁদেনা সোনা, কাঁদেনা।

আয় আয় চাঁদ মামা

আমার ঘরে আয়,

আমার সোনামণির সাথে

একটু খেলে যা।

দুধ দেবো, কলা দেবো

আরো দেবো খেলনা,

একসাথে দু’জনকে

শুতে দেবো দোলনা।

কাব্য হাঁসে। ইয়াছমিন অনেক খুঁশি হয়। নাকে, গালে, কপালে এঁকে দেয় স্নেহের পরশ। কাব্য পরম মমতায় মুখ লুকায়। আমার সোনা অনেক ভালো। এখন একটু ঘুমাও। মা হাতের কাজ সেরে আসি। ইয়াছমিন চলে যায়। কাব্য ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে।

ফারুক এসে ইয়াছমিনের পেছনে দাঁড়ায়। তুমি কার সাথে কথা বলছ?

কাব্যর সাথে।

সারাদিন কি শুধু একই ধ্যান আর তপস্যা।

হবেনা কেন?

আমার খবর কি রাখার দরকার আছে?

অবশ্যই আছে। কিন্তু……….।

স্যরি। তোমার সাথে দুষ্টুমি করলাম। এখনতো কেবল আমার দায়িত্ব।

তবুও।

রাত অনেক হয়েছে, চলো খেয়ে নিই।

আচ্ছা। চলো।

০৪।

সবাই ব্যস্ত। আজ সেই বহু কাঙ্খিত দিন। ফারুক এদিক ওদিক হাঁটছে। কখন খবর আসবে, কখন শুনবে দু’জন ভালো আছে। এতো উৎকন্ঠা, এতো আনন্দ এই প্রথম ফারুক অনুভব করল। মানুষের জীবনে এমন সময় আসবে তা মানুষ কখনোও কি বুঝতে পারে? হয়তো পারে। কিন্তু এর মর্ম সঠিক ভাবে উপলব্দি করতে পারে কি? একটা আবেগি মন ছুঁটে যায় বার বার। জানতে ইচ্ছে করে। একটা সংবাদ মানুষের জীবনকে বদলে দিতে পারে। বদলে দিতে পারে মানুষের জীবনের চলার গতি। জীবনের ভালোলাগাগুলো কেন ক্ষণস্থায়ী হয়, সুখগুলো কেন বদলে যায় দ্রুত। প্রতিটা সেকেন্ডকে কেন মনে হয় এক একটা যুগ। ফারুক বার বার ঘড়ির দিকে তাকায়। দুপুর ১২.০০টা। শনিবার ৫ই এপ্রিল ২০০৫। দিনটা কেমন তা জানেনা। আল্লাহর প্রত্যেকটা দিন সমান কিনা তাও জানেনা ফারুক। এর মধ্যে প্রভেদ করার কোন অর্থই হতে পারেনা। ষাট সেকেন্ডে এক মিনিট। ষাট মিনিটে এক ঘন্টা। এভাবে কত ঘন্টা পার হবে তা একমাত্র তিনিই জানেন।

চলতে থাকে সময়। বাড়তে থাকে চিন্তা। এই চিন্তার পরিধিটা কোথায় তা জানেনা ফারুক। তবে একটা গন্তব্যের খোঁজে তার আসা যাওয়া। দুপুর ১.০০ মিঃ। এখনো নার্স কোন খবর নিয়ে আসছে না।

ইয়াছমিন ভালো আছে তো? ভালো আছে তো আমার সন্তান? অনেক অনেক দুর্ভাবনা এসে ঝমাটা পাকায় মাথায়। ফারুক সব কিছুকে পেছনে ফেলে হাঁটতে থাকে। কিন্তু তার এই হেঁটে চলা মাঝপথে তাকে থামিয়ে দেয়। ইয়াছমিনের চিৎকারের শব্দ তার কানে আসেনা। ফারুক ইয়াছমিনের কান্না সহ্য করতে পারেনা। তার খুব কষ্ট হয়! খুব কষ্ট! বাড়ী ভর্তি লোকজন। মা, শাশুড়ি, বোন। আরও অনেক আত্মীয় স্বজন। শুধু একমাত্র ফারুকই ওর কাছ থেকে দূরে। এই কষ্টকে চেপে রাখতেই তার আড়ালে থাকা। ইয়াছমিনের মুখটা বার বার ভেসে ওঠে। ও খুব কাঁদছে। ওর খুব কষ্ট হচ্ছে। হে রহমানুর রাহীম ওর কষ্ট কমিয়ে দাও। আমার সন্তানকে পৃথিবীর মুখ দেখার সুযোগ করে দাও। ফারুক নানান কথা বলে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানায়।

ফারুক আবারও ঘড়ির দিকে তাকায়। দুপুর ২.০০ মিঃ। উৎকন্ঠা বেড়েই চলছে। তার মনটা চলে যায় ইয়াছমিনের রুমে। ইয়াছমিন কেমন আছে? কেমন আছে আমার সন্তান? হে দয়াময় তুমি তাড়াতাড়ি আমাকে একটা ভালো খবর দাও।

ফারুকের চোখে জলকণা এসে ভীড় করে। নিমিষেই গড়বে একটা সমুদ্র। ফারুক চেপে রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করে। পারেনা। গড়িয়ে পড়ে কয়েক ফোটা জল। এখন সময় ২.৩০ মিঃ। ফারুক মনে মনে কত কিছু পড়তে থাকে। নার্স দৌড়ে আসে ফারুকের সামনে। ফারুক চমকে ওঠে। নার্সের মুখটা আনন্দে ঝলমল করছে। ফারুক খুশি মনেই তার দিকে তাকায়।

আপনার মেয়ে হয়েছে।

আলহামদুলিল্লাহ। ইয়াছমিন?

জ্বি, উনি ভালো আছেন।

ফারুকের আর দেরি সইছেনা। মেয়েকে দেখার প্রবল ইচ্ছা বুকের মাঝে চেপে রেখে বললেন, কখন ওকে দেখা যাবে।

কিছুক্ষণ পরেই আমরা আপনাকে ডাকব।

ঠিক আছে আপনি যান।

নার্স যাওয়ার নির্দেশ পেয়ে দ্রুত চলে যায়। ফারুক আবারও আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানায়। শুকরিয়া জ্ঞাপন করে। তার বুকটা আনন্দে আনন্দে একাকার। আজ তার সুখের দিন, ভালোলাগার দিন, ভালোবাসার দিন, হারানোর দিন। একটা রঙ্গীন স্বপ্নে বিভোর।

আব্বু, আব্বু।

বলো আম্মু।

আমার একটা পুতুল লাগবে।

এনে দেবো।

আমার একটা লাল ঘুঁড়ি।

ঘুঁড়ি দিয়ে তুমি কি করবে।

উড়াবো।

এটাতো ছেলেদের কাজ।

খেলাধুলায় ছেলে আর মেয়েদের প্রভেদ করবেন কেন?

স্যরি আম্মু। ভুল হয়ে গেছে। ঠিক আছে এনে দেবো।

সুস্মিতা আনন্দ করতে করতে চলে যায়। ফারুক তার দিকে তাকিয়ে থাকে। চোখের জল মোচে। এত আনন্দ সে রাখবে কোথায়?

ফারুকের মা পারুল বেগম হেঁটে আসছে। তার মুখটায় বিষণ্নতার ছাপ। কেন এই কালো মেঘের ছায়া তা ফারুক বুঝতে পারেনা। নাকি বোঝার দেয়াল তাকে ছুঁতে পারেনা। ফারুক হাসি মুখ নিয়ে মাকে সালাম করে। মা ছেলের মাথায় আশির্বাদের পরশ এঁকে দেয়।

বাবা।

বলো মা।

মায়ের চোখে জলকণা এসে ভীড় করে। ফারুক বুঝতে পারেনা এই আনন্দের দিনে কেন জলকণা আর জলছবি।

কি হয়েছে মা?

তোর মেয়ে।

ফারুকের বুকটা হঠাৎ দমকা বাতাসের আঘাতে থমকে দাঁড়ায়। ফারুক বুক চেপে ধরে বলে, আমার মেয়ের কি হয়েছে?

পারুল বেগম অঘোরে কেঁদে চলছে। শাড়ির আঁচলে চোখ মোচেন।

মা তুমি কাঁদছ কেন?

তোর মেয়ের বাম পা ছোট।

কি বলছ তুমি?

হ্যাঁ বাবা।

ফারুকের মা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। সেই কান্না আকাশ বাতাস ছুঁয়ে যায়। ফারুকও কেঁদে চলছে। কাঁদতে কাঁদতে ইয়াছমিনের রুমে ঢোকে। ইয়াছমিন কেঁদে চলছে। ফারুক কোন দিকে না তাকিয়ে মেয়ে সুস্মিতাকে বুকে টেনে নেয়। হাত দিয়ে পা ধরে দেখে।

হে মহান দয়াময় তুমি এই কোন শাস্তি আমাকে দিলে। আমি যদি কোন অপরাধ করেই থাকি তাহলে সেই শাস্তি কেন আমার মেয়ে পাবে? কেন তুমি এভাবে আমার স্বপ্ন গুলোকে ভেঙ্গে দিলে। কেন? কেন? কেন?

০৫।

আজ চার দিন গত হল। সবাই বলাবলি করছে, মেয়েটাকে মেরে ফেল। মেয়ে মানুষ, পঙ্গুত্বের জীবন নিয়ে কিভাবে বেঁচে থাকবে? এর চাইতে মরে যাওয়াই অনেক ভালো। ও যখন বুঝতে পারবে তখন বলবে, কেন আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছ অবহেলার পাত্রী হিসাবে। কেন আমাকে মেরে ফেলোনি? কেন? কেন?

নানা জনের নানা কথা ফারুকের মনটা ভেঙ্গে চুরে খান। ইয়াছমিন সে যে বিছানায় পড়ে আছে আর উঠার কোন নাম নেই। সারাক্ষণ শুধু কাঁদছে। এই কান্নার গন্তব্য কোথায় তারা কেউ জানেনা। তবুও কেঁদে চলছে।

ফারুকের ভেতর থেকে একটা মানুষ ফারুককে তাড়া করে। ফারুককে কি যেন বলতে চায়। ফারুক তার কথা শোনার বিন্দু মাত্র ইচ্ছা প্রকাশ করে না। অনেকদিন তার সাথে যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধে ফারুক পরাজিত হয়। সেই মানুষটা ফারুককে বলে, ফারুক।

হুঁ।

তুমি এতো ভেঙ্গে পড়ছ কেন?

কে আপনি?

আমি তোমারই তুমি।

মানে?

তুমি মন খারাপ করোনা।

কেন?

দুনিয়াতে এতো ডাক্তার থাকতে তুমি ভেঙ্গে পড়ছ কেন? সুস্মিতাকে ডাক্তার দেখাবে। বিদেশে নিয়ে যাবে। ওর পা লাগাবে। ওকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলবে। দেখবে তোমার এই মেয়েটাই হবে একদিন তোমার গর্ব।

ফারুকের ভেতরের ঘুমরে থাকা মানুষটা জেগে ওঠে। চোখের জল মোচে। তার মুখটা আনন্দে ভরে ওঠে। দ্রুত ইয়াছমিনের রুমে যায়। ইয়াছমিনের চোখ ফোলা। কেঁদে কেঁদে চোখটা তার রাঙ্গা হয়ে গেছে। ফারুক সুস্মিতাকে বুকে টেনে নেয়। কপালে, মুখে ভালবাসার পরশ এঁকে দেয়।

ইয়াছমিনের দিকে তাকায়। ইয়াছমিনের মুখটা অপরাধের ছায়ায় পরিপূর্ণ।

মন খারাপ করোনা। আল্লাহ আমাদের যা দিয়েছেন তাতেই আমাদের খুশি থাকা উচিত। না হলে তিনি নারাজ হবেন। আমরা আমাদের মেয়েকে পঙ্গুত্বের অভিশাপ থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করব। লেখাপড়া শিখিয়ে ওকে মানুষ করব। বিদেশে নিয়ে যাবো। দেখবে আমাদের চেষ্টা বিফলে যাবে না। কে কি বলল তা নিয়ে একদম মন খারাপ করবে না। প্লিজ, একটু হাঁসো। একটু হাঁসো।

ইয়াছমিন হাসে। তার মুখে আনন্দের বন্যা। সুস্মিতাকে কোলে তুলে নেয়। কপালে, মুখে আদর করে। সুস্মিতার মায়াবি চোখ দুটো ইয়াছমিনের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে।

লেখক – মোঃ আলমগীর হোসেন ফারুক

 

বিসিসি নিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

মন্তব্য করুন