বই পর্যালোচনা

বৃহস্পতিবার | ২৩ নভেম্বর, ২০১৭ | ৯ অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ | ৩ রবিউল-আউয়াল, ১৪৩৯

প্রচ্ছদ » শিক্ষা » বই পর্যালোচনা » ব্যারিষ্টার মোঃ আব্দুল হালিমের ত্রয়োদশ সংশোধনী বিষয়ক বই

ব্যারিষ্টার মোঃ আব্দুল হালিমের ত্রয়োদশ সংশোধনী বিষয়ক বই

ব্যারিষ্টার মোঃ আব্দুল হালিমের ত্রয়োদশ সংশোধনী বিষয়ক বই

Judgement

ত্রয়োদশ সংশোধনীর যাবতীয় দিক সম্পর্কে জানতে হলে ব্যারিষ্টার মোঃ আব্দুল হালিমের The Thirteenth Amendment Judgment এই বইটি পড়তে পারেন। ব্যারিষ্টার মোঃ আব্দুল হালিম সাধারণত সহজ ভাষায় আইনের বই লিখে থাকেন, যা আপনার ভাল লাগবে বলে আশাবাদী।

বইটিতে স্থান পেয়েছে ত্রয়োদশ সংশোধনী সংক্রান্ত হাইকোর্ট বিভাগের পূর্ণ বেঞ্চের রায়, আপীল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় এবং বইটির তৃতীয় ভাগে স্থান পেয়েছে আপীল বিভাগের সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ের উপর লেখকের বিশ্লেষণধর্মী মতামত।
বাংলাদেশর জাতীয় নির্বাচনগুলোতে ক্ষমতাশীল দল ও সরকার কর্তৃক সীমাহীন কারচুপির অভিযোগের পথ ধরে ১৯৯৬ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকার সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিধান সংবিধানে অর্ন্তভুক্ত করে।

১৯৯৬ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত যে কয়টি জাতীয় নির্বাচন নির্দলীয় তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছে, তার প্রত্যেকটি অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়েছে বলে বিশ্বব্যাপী প্রচার পেয়েছে।

১৯৯৯ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীর সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে একজন আইনজীবি হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন। হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ ২০০৪ সালে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বৈধ বলে রায় দেয়। পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের রায়ের মূলনীতি ছিল যে, ত্রয়োদশ সংশোধনী সংবিধানের কোন মৌলনীতিকে আহত করেই নাই; বরং ইহা গণতন্ত্র নামক মৌলনীতিকে শক্তিশালী করেছে।

পরবতীকালে পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের রায়ের বিরুদ্ধে আপীল বিভাগে আপীল দায়ের করা হয় এবং আপীল বিভাগ ২০১১ সালের ১০ইং মে তারিখে সংক্ষিপ্ত আদেশের মাধ্যমে ত্রয়োদশ সংশোধনীকে অসাংবিধানিক বলে রায় দেয়। এরপর দীর্ঘ ১৬ মাস পরে ২০১২ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বরে ৭৭৪ পৃষ্ঠার পূণাঙ্গ রায় প্রকাশ করে। উক্ত রায়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকবৃন্দের পক্ষে রায় লিখেছেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি জনাব খায়রুল হক।

৭৭৪ পৃষ্ঠার রায়ের মূল বক্তব্য হলো যে, তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিধান সংবিধানের মৌল কাঠামো নীতির সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ায় ত্রয়োদশ সংশোধনীটি অসাংবিধানক ও বাতিল। রায়ে বলা হয়েছে যে, ‘গণতন্ত্র ব্যবস্থাটি আমাদের সংবিধানের একটি মৌল কাঠামো এবং এক মুহূর্তের জন্যও দেশে জনপ্রতিনিধিবিহীন গণতন্ত্র থাকতে পারবেনা।

ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ৯০ দিন বা কিছু সময়ের জন্য হলেও গণতন্ত্রে শূন্যতা তৈরী করেছে। সুতরাং তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অবৈধ। সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ে অবশ্য মতামত রাখা হয়েছে যে, পরবর্তী দু’টি জাতীয় নিবার্চন তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে অনুষ্ঠিত করা যাবে তবে উক্ত তত্বাবধায়ক সরকারে কোন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে নেয়া যাবে না; এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে উহা গঠিত হবে।

সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ের এই মতামতটি সাংঘর্ষিক ও বিতর্কিত বলে মনে করেন লেখক ব্যারিষ্টার আব্দুল হালিম। তার মতে পরবর্তী দু’টি নির্বাচন তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনে করতে হলে তত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংবিধানে থাকতে হবে।
কিন্তু ২০১১ সালের ১০ই মে তারিখ থেকেই তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিধান সংবিধানে অনুপস্থিত। তাহলে কিভাবে তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আগামী দু’টি জাতীয় নিবার্চন অনুষ্ঠান করা যাবে? কিভাবে এবং কোন কর্তৃত্বে তত্বাবধায়ক সরকারকে নিয়োগ দেয়া হবে? এরুপ মতামতের মাধ্যমে সুপ্রীমকোর্ট পার্লামেন্টকে এক অর্থে আইন প্রনয়নের দিক নির্দেশনা দিয়েছে যা আদালত পারে না বলে ব্যারিষ্টার হালিম মনে করেন।

ব্যারিষ্টার হালিম তার মূল্যায়ন অংশে একাধিকভাবে দেখানোর চেষ্টা করেছেন যে, কী কী ভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠের এই রায় প্রশ্নবিদ্ধ এবং প্রতিষ্ঠিত বিচার বিভাগীয় বিভিন্ন নীতির সাথে বিরোধপূর্ণ।

লেখক আরও বলেন যে সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ে যেসব আমেরিকান ও যুক্তরাজ্যের সাংবিধানিক নজিরের উপর নির্ভর করা হয়েছে তার বেশীর ভাগ ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের ক্ষেত্রে সম্পর্কিত নয়। উদাহারণস্বরপ, সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ে বার বার Marbury v. Madison, Baker v. Carr, Dennis v. USA, USA v. Yale Todd ইত্যাদি মামলার রায়কে অনুসরণ করা হয়েছে। কিন্তু এইগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রীমকোর্ট কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের কোন সংশোধনী বাতিল করে দেয়নি।

সংবিধানের মৌলনীতি (basic structure) ধারনাটি কেবলমাত্র ভারতীয় সুপ্রীমকোর্ট গ্রহণ করে এবং কতিপয় সংবিধান সংশোধনীকে বাতিল করে দেয়। কিন্তু ভারতীয় সুপ্রীমকোর্ট যে কয়টি মামলায় basic structure-এর দোহাই দিয়ে সংবিধানের সংশোধনীকে বাতিল করে দেয়, তার প্রত্যেকটি মামলায় একটি বিষয় সাধারন ছিল এবং তা ছিল যে, সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে নাগরিকদের কোন না কোন মৌলিক অধিকারকে আহত বা ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে কোন মৌলিক অধিকারকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ে অনুপস্থিত।

৭৭৪ পৃষ্ঠার বইটি  প্রকাশ করেছে সিসিবি ফাউন্ডেশন। মূল্য ৮০০ টাকা মাত্র।

ব্যারিষ্টার হালিমের সহজবোধ্য বিভিন্ন আইনের বই ছাড়াও কতিপয় গবেষনাধর্মী বই রয়েছে যার মধ্যে সংবিধান, সাংবিধানিক আইন ও রাজনীতি (সর্বশেষ সংস্করন ২০০৮), Making the Constitution of Bangladesh (2011)এবং Amendments of the Constitution of Bangladesh: Legislative versus Judicial (2012) অন্যতম।

 

বিসিসি নিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

মন্তব্য করুন