এই মুহূর্তে

শুক্রবার | ১৭ নভেম্বর, ২০১৭ | ৩ অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ | ২৭ সফর, ১৪৩৯

প্রচ্ছদ » এই মুহূর্তে » হরতাল উৎকন্ঠার শেষ এখন মৃত্যুতে

হরতাল উৎকন্ঠার শেষ এখন মৃত্যুতে

হরতাল উৎকন্ঠার শেষ এখন মৃত্যুতে

গণতন্ত্র ও সংবিধান উভয়ই মানুষের জন্য । মানুষের কল্যানেই এ দুটোর সৃষ্টি, আর গণতন্ত্রের মূল চালিকা শক্তি হল জনগন । আমাদের দেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ। প্রতি পাঁচ বছর পর পর এখানে ক্ষমতার পালা বদল হচ্ছে । বিশ্ব পরিমন্ডলে দেখা যায় প্রতিটি দেশেই ক্ষমতা পরিবর্তনের  সময় অস্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করে। কিন্তু আমাদের দেশে এই অস্থিতিশীলতার পরিমানটা তুলনামূলকভাবে বেশি। এখানে দেখা যায় যে, সরকারের শেষ সময়ে বিরোধীদল তাদের বিভিন্ন দাবি আদায়ের লক্ষ্যে হরতাল, অবরোধসহ নানা ধরনের কর্মসুচি দিয়ে থাকে।

বিভিন্ন রাজনৈতিক দল হরতাল একটি গণতান্ত্রিক অধিকার বলে বুলি আওড়িয়ে জনগনের স্বার্থের কথা বলে এ রকম কর্মসূচি ঘোষণা করে। প্রত্যেক দল হরতাল দেয়ার সময় বলে তারা জনগনের স্বার্থে হরতাল আহ্বান করেছে। কিন্তু অধিকাংশ হরতালে জনগনের উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হয়। হরতালের সময় অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থীসহ সকলকে পড়তে হয় চরম ভোগান্তিতে। বাদ যায় না রোগীর অ্যাম্বুলেন্সও। দিন মজুর শ্রেণীর মানুষের আয়ের পথ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।

হরতালে নিজের আয়ের উপর কেমন প্রভাব পড়ে তা জানতে চাইলে  সিএনজি চালক রহিম জানান, ‘মালিককে জমা দেয়ার টাকাটাও আসে না। আর সংসার কি করে চালাব আল্লাহই ভাল জানে। হরতাল হলো আমাদের জন্য অভিশাপ’।

হরতালের সময় রাজধানীর মিরপুর, উত্তারাসহ সকল রাস্তাতেই অফিসগামী মানুষের একটি ভোগান্তির দৃশ্য ফুটে উঠে । এ সময় গাড়ি পেয়ে নিরাপদে অফিসে পৌছতে পারা যেন সোনার হরিণ পাওয়ার মতই কঠিন বিষয়, যা ফুটে ওঠে তাদের কথাতেই।

এ প্রসঙ্গে সিটি ব্যাংকের কর্মকর্তা আনিসুর রহমান বলেন, হরতালের সময় রাস্তায় গাড়ি কম থাকায়  গাড়ির জন্য অনেকক্ষন অপেক্ষা করতে হয় । দীর্ঘক্ষন অপেক্ষার পর গাড়ি আসলেও তাতে ওঠার মত কোন পরিস্থিতি থাকে না, ফলে অফিসে যাওয়ার জন্য চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়।

রাজনৈতিক অস্থিতীশীলতার কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্লাস, পরীক্ষা স্থগিত রাখা হয়। যার প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশন জটের জালে আবদ্ধ হয় এবং শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে ঝড়ে যায় মূল্যবান সময়। বিঘ্নিত হয় শিক্ষার সুন্দর পরিবেশ।

এ প্রসঙ্গে মনিপুরী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক রিয়াদুল ইসলাম বলেন, হরতালের কারনে নিয়মিত ক্লাস না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের সিলেবাস ঠিকমত শেষ করা যাচ্ছে না । ফলে তাদের উপর চাপ বাড়ছে এবং সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও ক্লাস করতে হচেছ ।

সম্প্রতি জেএসসি এবং জেডিসি পরীক্ষার সময় টানা তিন দিনের হরতাল হবার কারণে পিছিয়ে যায় পরীক্ষার সময়সূচি। যার ফলশ্রুতিতে সরকারী ছুটির দিনসহ টানা পরীক্ষার হলে বসে পরীক্ষা দিতে হবে নাবালক শিক্ষার্থীদেরকে। উদ্বেগ আর উৎকন্ঠায় থাকতে হয় অভিভাবকদের। অনেকেই বলছেন এভাবে টানা পরীক্ষার কারণে রেজাল্টের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এবং তা হতে পারে একজন শিক্ষার্থীর জীবনের জন্য অভিশাপস্বরূপ।

শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, রাজনৈতিক সংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ পরছে। তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। তাদের সাহস এবং উৎসাহ ম্লান হচ্ছে। আর হরতালের কারণে বারবার পরীক্ষার সময়সূচি পরিবর্তন করতে হচ্ছে বলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরীক্ষা শেষ করা যাচ্ছে না।

একদিন হরতালে অসংখ্য গাড়ি ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। প্রাণ হারায় অসংখ্য নিরাপরাধ মানুষ। অর্থনীতিতে নেমে আসে এক কালো অধ্যায়। গাড়ি পোড়াতে ব্যাবহার করা হয় জীবননাশক গান পাউডার। মুহুর্তের মধ্যে একটি কোটি টাকার গাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। অনেক সময় যাত্রী গাড়ি থেকে নামার আগেই আগুন দেয় পিকেটাররা। এতে করে জ্বলন্ত আগুনে পুড়ে মরতে হয় শিশু, নারীসহ অসংখ্য মানুষকে।  গত ৪ই  নভেম্বর হরতালে পিকেটাররা একটি কার্ভাড ভ্যানে আগুন দিলে মনির নামের এক শিশু  অগ্নিদগ্ধ হয়ে নৃসংসহভাবে নিহত হয়। গত তিনদিনে মারা গেছে আসাদ গাজী সহ নাসিমা, মন্টু পাল মারা গেছে হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে লড়াই করে। আজকের দেওয়া পুলিশের তথ্য মতে গত কয়েকদিনের বিরোধীদলের ডাকা টানা ১০ দিনের হরতালে ৭৬ জন পেট্রোল বোমা ও আগুনে পুড়ে দগ্ধ হয়েছেন। এদের মধ্যে সবাই এখনো আশংকা মুক্ত নয়।

ইউএনডিপি’র প্রকাশিত এক জরিপে দেখা যায়  ১ দিনের হরতালে প্রায় ৫৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হয় । আর ১৯৯০-২০০০ সাল পর্যন্ত হরতালের কারণে প্রায় ৮০ হাজার ৩০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুয়ায়ী, ১৯৯৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরে রাজনৈতিক সহিংসতায় মারা গেছেন ২০৩৪ জন । এর মধ্যে ১৯৯৯ সালে ২৩৩ জন, ২০০০ সালে ২০৮ জন , ২০০১ সালে ৫০০ জন, ২০০২ সালে ৩১০ জন, ২০০৩ সালে ২০৩ জন, ২০০৪ সালে ৫২ জন, ২০০৫ সালে ৩৪ জন, ২০০৬ সালে ১২০ জন, ২০০৮ সালে ৪ জন, ২০০৯ সালে ৪২ জন, ২০১০ সালে ৭৬ জন, ২০১১ সালে ৫৮ জন,২০১২ সালে ৮৪ জন এবং ২০১৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ৩০৪ জন নিহত হয়েছেন।

এছাড়া চলতি বছরে মে মাস পর্যন্ত সারা দেশে হরতাল হয়েছে মোট ৩২ দিন আর এ সময় নিহত হয়েছেন অন্তত ৮৯ জন৷ এছাড়া, হরতালের সহিংসতায় আহত হয়েছেন আরো ১,৫৭৪ জন৷ তবে হরতালের বাইরে রাজনৈতিক সহিংসতা মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা ১৯২ জন৷ আর আহত হয়েছেন ৩,৪০০ জন৷

সাম্প্রতিককালের হরতালের সময় হজ্জ শেষে ফিরে আসা হাজীরা তাদের বাড়ীর উদ্দেশ্যে যেতে পারেনি। অনেকে উপায়ান্তর না পেয়ে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া নিয়ে তাদের নিজ বাড়িতে গেছেন। তার বদৌলতে গুনতে হয়েছে অধিক অঙ্কের ভাড়া ।

ককটেল, বোমা বিস্ফোরণের মাধ্যমে মানুষের মাঝে সৃষ্টি হচ্ছে আতঙ্ক। অনেক শিশুরাই আবার ককটেলকে খেলনা সামগ্রী মনে করে স্থায়ী ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছে।

হরতালের সময় রাজধানীতে বড় বড় মার্কেটসহ অধিকাংশ দোকান-পাট বন্ধ থাকে, কমে যায় ব্যাংকের লেনদেন ।ফলে দেশের অর্থনীতিতে নেমে আসে স্থবিরতা।

বিভিন্ন সময় সুশীল সমাজ এবং ব্যাবসায়ী সংগঠনগুলো হরতাল বন্ধের ব্যাপারে কঠোর আইন করার দাবি জানালেও কার্যত এ ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। খোদ বর্তমান সরকারের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত একটি অনুষ্ঠানে হরতালকে সাগরে ফেলে দেয়ার ‍আহবান জনালেও সরকার  এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোন পদক্ষেপ নেয়নি । এর পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকেই বড় করে দেখছেন  সাধারন মানুষ।

 

বিসিসি নিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

মন্তব্য করুন