এই মুহূর্তে

মঙ্গলবার | ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ | ১০ আশ্বিন, ১৪২৫ | ১৪ মহররম, ১৪৪০

প্রচ্ছদ » এই মুহূর্তে » বার্ন ইউনিটের মৃত্যুযন্ত্রণা বলছে “সংবিধান কি মানুষ মারার জন্য”

বার্ন ইউনিটের মৃত্যুযন্ত্রণা বলছে “সংবিধান কি মানুষ মারার জন্য”

বার্ন ইউনিটের মৃত্যুযন্ত্রণা বলছে “সংবিধান কি মানুষ মারার জন্য”

মৃত্যুযন্ত্রণা কি বলছে তা উপলব্দি করার মত সংবিধান বিশেষজ্ঞ ওরা নয়।কিন্তু ওদের সবার মনে একটাই প্রশ্ন আমরা সংবিধান বুঝিনা, তাহলে আমরা কেন পুড়ব আর মরব।নিচে কয়েকটি মৃত্যুযন্ত্রণার চিৎকারের বিবরণ  তুলে ধরা হলঃ

বার্ন ইউনিটে গিয়ে দেখা যায়, অবরোধের আগুনে পোড়া নিহত আনোয়ারা বেগমকে (৪৫) ঘিরে স্বজনদের আর্তনাদ। আহতদের স্বজনদের চোখে-মুখে আতংক। নৃশংসতায় চিৎকার করে আর্তনাদ করছেন স্বজনরা। নিহত আনোয়ারা বেগমের মেয়ে নাছিমা বেগম জানান, তাদের গ্রামের বাড়ি খুলনা রূপসা থানার লবনচরা গ্রামে। প্রায় ২০ বছর আগে বাবা  মারা যান। তখন থেকেই মা-ই ছিল তাদের অভিভাবক। দু’ ভাইয়ের মধ্যে আলম মিয়া রিকশা ও আরিফ মিয়া ভ্যান চালান। তার মা প্রায় ১৭ বছর ধরে মালিবাগ শাখার ন্যাশনাল ব্যাংকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রান্না-বান্নার কাজ করতেন। মঙ্গলবার বিকালে ব্যাংক থেকে বাসায় ফেরার পথে খিলগাঁও তিলপাপাড়া এলাকায় অবরোধকারীরা তার মাকে লক্ষ্য করে ককটেল বোমা নিক্ষেপ করলে মায়ের মাথায় পড়ে। এ সময় তার মা জ্ঞান হারিয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন। ককটেলের আঘাতে মায়ের মাথাসহ ঘাড় ক্ষত-বিক্ষত হয়। ছেলে আলম ও আরিফ জানান, তারা খুবই দরিদ্র, রিকশা-ভ্যান চালিয়ে কোনো রকমে বেঁচে আছেন। ক্ষোভ প্রকাশ করে তারা জানালেন, কী দোষ ছিল তাদের মায়ের? হরতাল-অবরোধে রাজনৈতিক দলের কোনো নেতা কর্মী তো অগ্নিদগ্ধ কিংবা ককটেল, পেট্রোল বোমায় আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে না। প্রাণ হারাচ্ছে না। সাধারণ মানুষ কেন মরছে?

লেগুনাচালক মোজ্জাম্মেল হক (২৭) ৬৫ শতাংশ পোড়া শরীর নিয়ে বার্ন ইউনিটে মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাছ্ছেন। যন্ত্রণা কণ্ঠে মোজ্জামেল হক জানান, মঙ্গলবার সন্ধ্যার দিকে রামপুরা-বনশ্রী রোডে যাত্রী নিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। দক্ষিণ বনশ্রী রোড বরাবর গেলেই অবরোধকারীরা তার লেগুনা ভাংচুর শুরু করে। এক পর্যায়ে অবরোধকারীরা তাকে ভেতরে রেখে দরজা বন্ধ করে যাত্রীদের ভয়-ভীতি দেখিয়ে নামিয়ে দেয়। ‘এই শালা অবরোধের মধ্যে কেন গাড়ি বের করলি’ এমন গালমন্দ করে তাকে গাড়ির ভেতরে আটকিয়ে পেট্রোল দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ সময় তাকে বাঁচাতে কেউই এগিয়ে আসেনি জানিয়ে মোজাম্মেল হক বলেন, জীবন বাঁচাতে তিনি জোরে দরজায় ধাক্কা দিলে তা ভেঙে যায়। জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তিনি। এরপর আর কিছুই বলতে পারেননি তিনি।সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের ভাষ্য, মোজাম্মেল হকের শরীর ৬৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। আশংকাজনক অবস্থায় তিনি রয়েছেন।

 ভাই সোহেল মিয়া জানান, তার মা পিয়ারা বেগম অন্ধ। অন্ধ মাকে নিয়ে দু’ভাই মাদারটেক নন্দীপাড়া এলাকায় একটি ছোট্ট বাসায় ভাড়া থাকেন। বাবা আরজু মিয়া প্রায় ১২ বছর আগে মারা গেছেন। সেই থেকে মাকে নিয়েই দু’ভাই থাকছেন। দু’ভাই মিলে ভাড়ায় গাড়ি চালাতেন। অন্ধ মা এখনও জানেন না মোজাম্মেল মৃত্যুশয্যায় রয়েছেন। ফুফু সাজেদা বেগমসহ বেডে থাকা রোগীদের স্বজনদের প্রশ্ন, তাদের স্বজনদের কেন এমন অবস্থা?

মঙ্গলবার সন্ধ্যার দিকে রমনা থানার পাশ দিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালিয়ে যাচ্ছিলেন চালক নিজাম উদ্দিন। এ সময় অবরোধকারীরা তার গাড়িটি দাঁড় করিয়ে তাকে জোর করে ভেতরে বসিয়ে গাড়িটিতে পেট্রোল দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। ১৫ শতাংশ পোড়া শরীর নিয়ে বার্ন ইউনিটে ভর্তি রয়েছেন তিনি। জানালেন, তার কিছু হয়ে গেলে পরিবারের সদস্যরা না খেয়ে মরে যাবে। পল্টনে ফল ব্যবসা করতেন আলমগীর হোসেন (৩৪)। জানালেন, অবরোধকারীরা তাকে লক্ষ্য করে ককটেল নিক্ষেপ করেন। তার হাত-পা ঝলসে যায়। গাজীপুর চৌরাস্তায় অবরোধকারীরা খলিল নামক দরিদ্র কৃষককে লক্ষ্য করে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। আবদুল খলিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।

 সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক সবেত আলী (৪০) ১৫ শতাংশ পোড়া শরীর নিয়ে বার্ন ইউনিটে ভর্তি রয়েছেন। জানালেন, মঙ্গলবার সন্ধ্যার দিকে ইস্টার্ন প্লাজার সামনে তার গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে অবরোধকারীরা। স্ত্রী আলেয়া বেগম জানান, তার স্বামী ভাড়া গাড়ি চালাতেন। স্বামীর কিছু হয়ে গেলে কিভাবে বাঁচবেন জিজ্ঞেস করতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। কুমিল্লা থেকে আসা সিএনজি চালক রুবেল মিয়া ২৩ শতাংশ পোড়া শরীর নিয়ে মঙ্গলবার ভর্তি হন বার্ন ইউনিটে। জানালেন, অবরোধকারীরা তাকে সিএনজি থেকে নামতে সুযোগ দেয়নি। তাকে ভেতরে রেখেই গাড়িতে পেট্রোল দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়।

আমি সুস্থ হয়ে আবার স্কুলে যেতে পারবো তো। মা ও দাদার কাছে ফিরে যেতে পারবো তো?’ তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে কৃষক বাবা জাফর খানের কাছে বারবার কথাগুলো বলছিল সাত বছরের শিশু রাকিব। কিন্তু অসহায় বাবা কোনো উত্তর খুঁজে না পেয়ে অবুঝ সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে অঝোর ধারায় কাঁদছিলেন। এ দৃশ্য ছিল গতকাল বুধবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে।rakibe barn

চাঁদপুর সদরের পশ্চিম বাখেরপুর বাজারে চায়ের দোকানে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই সমর্থকের ঝগড়ার এক পর্যায়ে একজন অন্যজনের প্রতি গরম চায়ের কেটলি ছুড়ে মারলে পাশে বসে থাকা শিশু রাকিবের বুক, হাত-পাসহ সারা শরীর ঝলসে যায়। গত সোমবার বিকালে এ ঘটনা ঘটে। রাকিবকে প্রথমে চাঁদপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং পরে ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে স্থানান্ত্র করা হয়। আহত রাকিব বাখেরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণীতে পড়ে।

বাবা জাফর খান বলেন, সোমবার বিকালে টমেটোর চারা গাছ বিক্রির করার জন্য ছেলেকে নিয়ে বাখেরপুর বাংলা বাজারে যাই। রাকিব চিপসের আবদার করলে তা কেনার জন্য স্থানীয় বাচ্চু মিয়ার চায়ের দোকানে যাই। ওই দোকানে বসেই চিপস খাচ্ছিল রাকিব। এ সময় আওয়ামী লীগ সমর্থক স্থানীয় শরীফ দোকানে আসে। চা দোকানি ছিলেন বিএনপির সমর্থক। নির্বাচনী তফসিল নিয়ে বাচ্চুর সঙ্গে শরীফের কথা হয়। এ আলোচনা তর্কে রূপ নেয় এবং দুজনে হাতাহাতি শুরু হয়। শরীফ তক্তা নিয়ে বাচ্চুকে মারতে গেলে বাচ্চু গরম চায়ের কেটলি ছুড়ে মারে। এ সময় কেটলিটি শিশু রাকিবের গায়ে পড়ে। কেটলির গরম পানিতে রাকিবের বুক, দুই হাতসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ ঝলসে যায়। রাকিবকে দ্রুত উদ্ধার করে প্রথমে চাঁদপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়।

চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানার আলমাস সিনেমার সামনে অবরোধকারীদের দেয়া আগুনে অটোরিকশা যাত্রী দুই ভাই অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন। তারা হলেন- মো. আবদুল আলিম (৩২) এবং মো. মোরশেদ (২০)। আহতরা নগরীর খুলশী থানার মহিলা কলেজ মোড়ে সুফি বাড়ির মো. সৈয়দ আহমেদের ছেলে। কাজির দেউড়ি ভিআইপি টাওয়ারে তাদের একটি রেস্টুরেন্ট আছে। সকালে নগরীর আলমাস মোড় দিয়ে মিছিল নিয়ে যাওয়ার সময় অবরোধকারীরা রাস্তায় সিএনজিচালিত অটোরিকশায় আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে ওই অটোরিকশার যাত্রী দু’ভাইয়ের শরীরের বিভিন্ন অংশ পুড়ে যায়। পথচারীরা তাদের উদ্ধার করে গুরুতর অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে (৩৬ নম্বর ওয়ার্ড) ভর্তি করে। চমেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের চিকিৎসক ডা. মৃণাল কান্তি বলেন, দু’জনের শরীরের ২২ শতাংশ পুড়ে গেছে। ঝলসে গেছে তাদের পিঠ, মাথা ও মুখের বিভিন্ন অংশ।

 

বিসিসি নিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।


মন্তব্য করুন