বিদেশি সাহিত্য

মঙ্গলবার | ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ | ১০ আশ্বিন, ১৪২৫ | ১৪ মহররম, ১৪৪০

প্রচ্ছদ » সাহিত্য জগৎ » বিদেশি সাহিত্য » সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী লেখক মো ইয়ান-১

সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী লেখক মো ইয়ান-১

সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী লেখক মো ইয়ান-১

গত ১১ অক্টোবর স্থানীয় সময় বিকেলে একটায় সুইডেনের সাহিত্য একাডেমীর স্থায়ী সচিব পোর্ট এনক্রোন প্রথম সুইডিস ভাষা তারপর ইংরেজ ভাষায় ঘোষণা করেন,২০১২ সালের নোবেল সাহিত্য পুরস্কার চীনের লেখক মো ইয়ানকে দেয়া হবে। মো ইয়ানের নোবেল সাহিত্য পুরস্কার জয়ের খবর সারা চীনের মতো তাঁর জন্মস্থান সানতং প্রদেশের কাও মি শহরেও ছড়িয়ে পড়ে এবং সারা চীনের মতো সেখানেও উত্সবের ধুম পড়ে যায়। সর্বত্র শোনা যায় পটকাবাজির গুমগুম শব্দ।

মো ইয়ানের আসল নাম গুয়ান মো ইয়ে। মো ইয়ান তাঁর ছদ্মনাম। ১৯৫৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারী সানতং প্রদেশের গাওমি শহরের উপকন্ঠের পিং আন গ্রামের একটি কৃষক পরিবারে মো ইয়ান জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবারের আদি বসতবাড়ির সামনে সিমেন্টের খোলা মাঠে ক্ষেত থেকে গ্রামবাসীদের তুলে আনা ভুট্টাগুলো রোদে শুকানো হয়। অদূরে নিরবে বয়ে যাচ্ছে চিয়াও নদী। নদীর ধার প্রায় এক মিটার উঁচু শুকনো ঘাসে আবৃত। এ আদি বসতবাড়িতে কেটেছে মো ইয়ানের ২০ বছর ।

২০১২ সালের নোবেল সাহিত্য পুরস্কার মো ইয়ানকে দেয়ার খবর প্রচারিত হওয়ার পর পরই মো ইয়ানের ছেলেবেলার খবর নিতে দেশবিদেশের সংবাদদাতারা এ প্রত্যন্ত গ্রামে এসে ভীড় জমান। মো ইয়ানের মেজ ভাই গুয়ান মে সিংকে তাই এক এক বার আদি বসতবাড়ির দরজা খুলে এক এক দল সাংবাদিককে নিয়ে ভেতরে গিয়ে মো ইয়ানের রেখে যাওয়া স্মৃতি রোমন্থন করতে হয়।

মোইয়ানের ভাইয়ে উক্তি:“৬০ বছর বয়স্ক মো সিং সাংবাদিকদের বলেন, ছোটবেলায় মো ইয়ান ছিলেন ভারী চঞ্চল ও দুষ্ট; এক মিনিটিও স্থির হয়ে বসে থাকতেন না। ঘুরে বেড়াতেই তাঁর ভাল লাগতো। তিনি গাছে চড়ে পাখির বাসা থেকে ডিম বের করতেন এবং নদীতে নেমে মাছ ধরতেন। কোনো জিনিষ হাতে পেলে তা নাড়াচাড়া করতেন অনেকক্ষণ। একদিন এক ছোট বন্ধুর হাতে একটি গুলতি দেখে চট করে তা কেড়ে নিয়ে তন্ন তন্ন করে দেখলেন। তখন বনে অনেক পাখি উড়তে দেখা যেতে। তার সাথীরা গুলতি দিয়ে পাথরের টুকরো ছুঁড়ে পাখি মারতো। মো ইয়ান গ্রামের বুড়ো মানুষের হাত ধরে পাখির নাম জিজ্ঞেস করতেন”।

খুব অল্প বয়সেই সাহিত্য সম্বন্ধে মো ইয়ানের মনে আগ্রহ জাগে। গ্রামে তখন বৈদ্যুতিক বাতি ছিল না। তেলের বাতি জ্বালিয়ে বই পড়তেন তিনি । মা কিছুক্ষণ পর পর বলে উঠতেন,তেল যে ফুরিয়া আসছে,আর পড়ো না, খাটে ওঠে ঘুমাও । কিন্তু তিনি এত মনোযোগের সংগে বই পড়তেন যে,মায়ের কথা শুনতেই পেতেন না।

বই পড়া মো ইয়ানের সখ। কিন্তু বই কেনার টাকা ছিল না তাঁর পরিবারের। তাই পাড়াপড়শীর বই ধার নিতে হত; বই ধার নেয়ার বিনিময়ে তিনি পড়শীর কাজও করে দিয়েছেন কখনো কখনো। একদিন কাজ করে সন্ধ্যায় তিনি এত ক্লান্ত যে, পা আর সরতে চায় না। কিন্তু বই পাওয়ার পর তিনি সেই ক্লান্তি ভুলে যান।

আট বছর বয়স থেকে তিনি ‘তিন রাজ্যের যুদ্ধ’ ‘জলাশয়’ ‘বরফাবৃত বন’প্রভৃতি ধ্রুপদী খ্যাতনামা উপন্যাস পড়তে শুরু করেন। গল্পের বই যখন পাওয়া যেত না, তখন তিনি বড় ভাইয়ের চীনা ভাষার অভিধানের পাতা উলটাতে উলটাতে চীনা শব্দ মুখস্থ করতেন। প্রথমবার প্রথম পৃষ্ঠা থেকে শুরু করে শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত আর দ্বিতীয় বার শেষ পৃষ্ঠা থেকে শুরু করে প্রথম পৃষ্ঠা পর্যন্ত এক একটি চীনা শব্দ তিনি মুখস্থ করতেন। কোন শব্দ কোন পৃষ্ঠায় আছে তাঁকে জিজ্ঞাস করলে তিনি সঠিক উত্তর দিতে পারতেন।

ছ’বছর বয়স্ক মো ইয়ান গ্রামের স্কুলে ভর্তি হন। যখন পঞ্চম শ্রেণীতে সবেমাত্র ওঠেন তখন চীনে সাংস্কৃতিক বিপ্লব ঘটে । গ্রামের স্কুল বন্ধ করে দেয়ার সাথে সাথে তাঁর পড়শোনাও বন্ধ হয়ে যায়। দশ বছর ধরে তিনি তুলা ও সরঘামের চাষ করতেন এবং ভেড়া চরাতেন। সেই সময়ের কথা স্মরণ করে তিনি একটি প্রবন্ধে লিখেন:

আমি রোজ পাহাড়ে গিয়ে গরু ও ছাগলের সঙ্গে কথা বলি, পাখিদের সঙ্গে গান গাই, একাগ্রচিত্তে গাছগাছালিকে বাড়তে ও ফুলকে ফুটতে দেখি। এ-কথা নি:সন্দেহে বলা যায় যে, আমার উপন্যাসে আকাশ বাতাস, আবাদি জমি, উদ্ভিজ ও প্রাণী সম্বন্ধে যে প্রচুর বর্ণনা আছে,সেগুলো সবই ছেলেবেলার স্মৃতি থেকে উদ্ভুত হয়েছে।

তাঁর বয়স যখন আঠারো তখন বাবা একদিন তাঁকে বললেন,জেলা শহরের তুলার বীজের তেল তৈরীর কারখানায় গিয়ে তাঁকে কাজ করতে হবে। লেখাপড়া ছেড়ে শ্রমিক হওয়ার লেশমাত্র উত্সাহ তাঁর ছিল না। কিন্তু তাঁর পরিবার অভাব-অনটনগ্রস্ত, তাঁকে বিদ্যালয়ে পড়তে দেয়ার মত সংগতি ছিল না। পেটের দায়ে তিনি বাধ্য হয়ে মজুরের কাজ করতে যান।

১৯৭৯ সালে মো ইয়ানের বিয়ে হয়। বাসর ঘরের একমাত্র দামী জিনিষ ছিল ৪৯.৫ ইউয়ানের একটি রেডিও সেট। একটি আয়নাও বিশেষভাবে তাঁদের জন্য কেনা হয়েছিল। রাতে বর-কনে ঘুমান মাটির খাটের ওপর শুয়ে। তাঁর স্ত্রী ছিলেন একজন কৃষকের মেয়ে। এক বছর পর তাদের মেয়ের জন্মও হয় এই মাটির খাটের ওপর।

১৯৭৬ সালের অগাস্ট মাসে মো ইয়ান চীনা গণ মুক্তি বাহিনীতে যোগদান করেন। পো সাগরের পারে তিনি শুকর পালন করতেন,শাকসবজির চাষ করতেন এবং রাতে সেনানিবাসে পাহারা দিতেন।

১৯৭৯ সালের শরতকালে মো ইয়ান গণমুক্তি বাহিনী জেনারেল স্টাফের সদরদফতরে বদলি হন। পর্যায়ক্রমে তিনি স্কোয়াড লিডার,গোপন দলিল সংরক্ষণকারী,গ্রন্থাগারের কর্মী,রাজনৈতিক শিক্ষক এবং প্রচার বিভাগের কর্মচারীর দায়িত্ব পালন করেন।

গণমুক্তি বাহিনীতে তরুণ মো ইয়ান লেখক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। কাঁচা লেখনি দিয়ে একের পর এক ছোট গল্প লিখে চীনের বিভিন্ন সংবাদপত্রিকা ও সাময়িকীতে পাঠাতেন। তিনি প্রতিবার পাণ্ডলিপি খামে ভরে ডাকে পাঠান এবং দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করতে থাকেন। অবশেষে ছিন্ন খামে ভরা পাণ্ডলিপি তাঁর হাতে ফিরে আসে। কেন যে ফেরত পাঠানো হল, তা ব্যাখ্যা করে টাইপ করা সম্পাদকের একটা চিঠিও অবশ্যই পাণ্ডলিপির সাথে আসে। এমন অনেকগুলো চিঠি পেয়েও তিনি হাল ছাড়েন না।

১৯৮১ সালে হেপেই প্রদেশের পাওতিন শহরের সাময়িকী “কমল পুষ্করিনী”র সম্পাদকমণ্ডলির কাছ থেকে একটি চিঠি পেয়ে তিনি আনন্দে নেচে উঠেন। এ-বছর “কমল পুষ্করিনী”র এক সংখ্যায় “বসন্ত রাতের বৃষ্টি” নামে তার একটি ছোটো গল্প প্রকাশিত হয়। এটাই তাঁর জীবনে প্রকাশিত প্রথম লেখা। একই বছর তার মেয়ে ভূমিষ্ঠ হয়। তিনি মেয়ের নাম দিয়েছেন ” সিয়াও সিয়াও”; চীনা ভাষায়” সিয়াও সিয়াও”র মানে নির্মল হাসি।

১৯৮৪ সালে মো ইয়ান খবর পান, চীনা গণ মুক্তিবাহিনীর শিল্পকলা কলেজের সাহিত্য বিভাগে ছাত্রছাত্রীদের নেয়া হচ্ছে । শিল্পকলা কলেজে ছুটে গিয়ে তিনি যখন জানলেন যে, শিক্ষার্থীদের নাম লেখানোর সময় পেরিয়ে গেছে,তখন তাঁর মাথায় যেন বজ্র ভেঙ্গে পড়ে। তবুও তিনি দমার পাত্র নন। সোজা সাহিত্য বিভাগের পরিচালক বিখ্যাক লেখক সু হুয়াই জংয়ের অফিসে গিয়ে নাম লেখাতে দিতে তাঁকে অনুনয় করেন। মো ইয়ানের লেখা ছোটো গল্প পড়ে তাঁর মধ্যে প্রতিভার পরিচয় পেয়ে সু হুয়াই জং তাঁকে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে বিশেষভাবে অনুমতি দেন।

ভর্তি পরীক্ষায় অনায়াসে পাস করে মো ইয়ান যথাসময়ে শিল্পকলা কলেজে ভর্তি হন। দু’বছরব্যাপী পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে তিনি “লাল সরঘাম”সহ আশি লাখ চীনা শব্দবিশিষ্ট একাধিক উপন্যাস লেখেন। ১৯৮৬ সালে মো ইয়ান শিল্পকলা কলেজ থেকে স্নাতক হন। শিল্পকলা কলেজে তাঁর পড়াশোনা সম্পর্কিত একটি প্রবন্ধে তিনি বলেন, আমার পরবর্তীকালের সাহিত্যসৃষ্টির ওপর দুবছরের লেখাপড়ার প্রভাব অত্যন্ত গভীর। আমি এ-কথা বুঝতে পেরেছি যে,পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে স্বতন্ত্র ধারার উপন্যাস লিখতে হবে।

১৯৯১ সালে মো ইয়ান পেইচিং প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয়ের লুসিন সাহিত্য একাডেমীতে সাহিত্যসৃষ্টির ওপর তার লেখা নিবন্ধ পাঠ করে মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন।

১৯৮৫ সালের বসন্তকালে সাহিত্য সাময়িকী “চীনা লেখক”-এ প্রকাশিত হয় মো ইয়ানের উপন্যাস “স্বচ্চ লাল মুলা”। তিনি এ-উপন্যাসের প্রধান চরিত্র হেই হাই অর্থাৎ কালো ছেলের মাধ্যমে তাঁর কৈশোরের দুর্বিষহ অবমাননা,নিরস নি:সংগ জীবন এবং রঙ্গিন স্বপ্ন দেখার ইতিবৃত্ত বর্ণনা করেন। ১৯৬৭ সালে ১২ বছর বয়সী মো ইয়ান ক্ষিদেয় অস্থির হয়ে চুপিসারে গণ কমিউনের উত্পাদন–টিমের সবজির খেতে গিয়ে একটা লাল মুলা তুলে মুখে দিতেই হাতেনাতে ধরা পড়েছিলেন। তখন তাঁকে জোর করে কর্মস্থলে নিয়ে যাওয়া হলে, সেখানকার সবাই তাকে অশ্লীল বাক্যে গালি দেয়। তিনি চেয়ারম্যান মাওয়ের মূর্তির সামনে হাটু গেড়ে কাঁদতে কাঁদতে শপথ নেন, পরে তিনি কখনো আর উত্পাদন–টিমের মুলা চুরি করবেন না।

ততোক্ষণে তার বাবা এ লজ্জাকর ঘটনার খবর পেয়েছেন। মো ইয়ানকে বাড়িতে ঢুকতে দেখেই বাবা রেগে আগুন হয়ে তাঁকে বেদম মারধর করলেন ।

“চীনা লেখক”এর প্রধান সম্পাদক ছিলেন মি: ফেং মু। তাঁর উদ্যোগে আয়োজিত এক আলোচনাসভায় নানা দিক থেকে ” স্বচ্চ লাল মুলা” বিশ্লেষণ করা হয়।

মো ইয়ান তাঁর একটি প্রবন্ধে এ উপন্যাস সম্বন্ধে বলেন: এ উপন্যাসের মালমসলা অতি সহজ,অতি আদিম। সাহিত্যের আতিশয্য বলতে কী বুঝায়, আমি তখন তা কিছুই জানি না, একথা সম্পূর্ণ সত্য নয়। তবে প্রধানত: ব্যক্তিগত জীবনের সঞ্চয় ও প্রত্যক্ষ সাহিত্যিক উপলব্ধির ওপর নির্ভর করেই সাবলীলভাবে এ উপন্যাস লেখা হয়েছে।

“স্বচ্চ লাল মুলা” সারাদেশে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয় এবং এটিই মো ইয়ানের জন্য খ্যাতি বয়ে আনা প্রথম উপন্যাস।

 

বিসিসি নিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।


মন্তব্য করুন