বিদেশি সাহিত্য

মঙ্গলবার | ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ | ১০ আশ্বিন, ১৪২৫ | ১৪ মহররম, ১৪৪০

প্রচ্ছদ » সাহিত্য জগৎ » বিদেশি সাহিত্য » সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী লেখক মো ইয়ান-২

সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী লেখক মো ইয়ান-২

সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী লেখক মো ইয়ান-২

মো ইয়ানকে নোবেল সাহিত্য পুরস্কার দেয়ার কারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন,মো ইয়ান লোক-কাহিনী, ইতিহাস ও সমকালীন সমাজের সাথে বাস্তবতাকে সার্থকভাবে সংযুক্ত করেছেন। তাঁর সাহিত্যজগতে প্রবেশ করলে উইলিয়াম ফোলকনার ও গ্যাব্রিল গার্সিয়া মার্কুজের রচনাশৈলীর কথা মনে পড়ে,সেই সাথে চীনের ঐতিহ্যবাহী সাহিত্য ও মৌখিক সাহিত্যের একটি নতুন সূচনার সন্ধানও পাওয়া যায়।

সামরিক শিল্পকলা কলেজ থেকে স্নাত্তক হওয়ার পর মো ইয়ান চীনা গণ মুক্তিবাহিনীর জেনারেল স্টাফের সদর দফতরের সাংস্কৃতিক বিভাগে যোগদান করেন।

১৯৮৫ সালে সি জে মেন হোটেলে চীনা গণমুক্তি বাহিনীর সাধারণ রাজনৈতিক বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত যুদ্ধবিষয়ক একটি সেমিনারে কয়েকজন প্রবীণ লেখক অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে বলেছিলেন,সোভিয়েত ইউনিয়নের মাতৃভূমি রক্ষার যুদ্ধ স্থায়ী ছিল মাত্র চার বছর;অথচ এ-যুদ্ধকে উপজীব্য করে দেশটির লেখকরা একের পর এক শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম রচনা করেছেন। অন্যদিকে,চীনের নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের ইতিহাস সুদীর্ঘ,আধুনিক যুগে চীনের যুদ্ধ স্থায়ী ছিল ২৮ বছর;নয়াচীন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও সীমান্তযুদ্ধ হয়েছে। কিন্তু এ-যুদ্ধ নিয়ে আমাদের কোনো মহান সাহিত্যকর্ম নেই। আমরা অনেকে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম,কিন্তু আমরা বুড়ো হয়ছি,নতুন কিছু লিখবার শক্তি আর নেই। অথচ তরুণ লেখকরা কেউ যুদ্ধে অংশ নেননি। যুদ্ধের ওপর উৎকৃষ্ট নতুন লেখা কী আর দেখা যাবে?

তাঁদের কথার খেই ধরে তখন মো ইয়ান বলেছিন: আমরা তরুণ লেখকরা কেউ যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই করিনি,একথা সত্য। কিন্তু আমরা যুদ্ধের মহড়ায় অংশ নিয়েছি। আমরা জাপানী হানাদারদের বিরুদ্ধে লড়াই করিনি,তাদের কাউকে হত্যা করিনি;কিন্তু বাড়িতে শুয়োর ও মুরগি তো জবাই করেছি। তাই উত্কৃষ্ট সাহিত্যকর্ম রচনা করতে না-পারার কোনো যুক্তি তো দেখছি না। আপনারা নিশ্চিত হোন,আমরা কেউ বাজে লোক নই।

তারঁ কথা শুনে একজন প্রবীন লেখক রেগে গেলেন এবং উঠে দাঁড়িয়ে তাকে ধমক দিয়ে বললেন,’ছোকরা, তোমার স্পর্ধা তো কম নয়! দেখছি।

মো ইয়ান পরে সাংবাদকিদের বলেন,”তখন আমিও ভেতরে ভেতরে গুমরে মরছিলাম,মনে মনে শপথ নিলাম, যেমন করে হোক, যুদ্ধের ওপর দু একটা ভালো উপন্যাস লিখে তাদের দেখাব।” যা ভাবলেন তাই করলেন তিনি। “লাল সরঘাম”,”অদ্ভুত মৃত্যু” সহ যুদ্ধবিষয়ক তাঁর অনেক উপন্যাস বের হল।

মো ইয়ানের পরিবারের আদি বসতবাড়ি থেকে উত্তর-পুর্ব দিকের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে একটি পাথরের সেতু আছে। মো ইয়ান ছোটবেলায় গ্রামের একজন বৃদ্ধের মুখে শুনেছেন,১৯৩৮ সালে চীনের গেরিলা দল সেই সেতুর দক্ষিণ মাথার দিকে জাপানী হানাদার বাহিনীর ওপর যে চোরাগোপ্তা আক্রমণ চালায় তাতে ৩৯ জন জাপানী সৈন্য নিহত হয়,তাদের মধ্যে একজন লেফটেনেন্ট জেনারেলও ছিল। তখনকার জাতীয় সরকার গেরিলা দলের প্রশংসা করে বিশেষ আদেশনামা জারি করেন। বস্তুত সেই চোরাগোপ্তা আক্রমণই উপন্যাস “লাল সরঘাম”-এর মূল বিষয়বস্তু।

মো ইয়ান বলেন,”লাল সরঘাম” এর পাণ্ডলিপি তৈরী করতে আমি সময় নিয়েছি মাত্র এক সপ্তাহ। ছেঁটে-ছুটে, মেজে-ঘষে ঠিক করতে আরেক সপ্তাহ সময় ব্যয় হয়।

১৯৮৬ সালে চীনের বিখ্যাত পরিচালক জাং ই মোউ “লাল সরঘাম” অবলম্বনে একই নামের যে-চলচ্চিত্র তৈরী করেন, তা ১৯৮৮ সালে বার্লিন চলচ্চিত্র উত্সবে ‘সোনালী ভালুক’ পুরস্কার অর্জন করে। “লাল সরঘাম”ই বিদেশের প্রথম শ্রেণীর চলচ্চিত্র উৎসবে চীনের প্রথম পুরস্কার বিজয়ী চলচ্চিত্র। এ চলচ্চিত্র বিভিন্ন দেশে প্রদর্শনের ফলে মো ইয়ানও সারাবিশ্বে খ্যাতি অর্জন করেন।

সাংবাদিকদের দেয়া এক সাক্ষাত্কারে চলচ্চিত্র ও সাহিত্য সম্পর্কে মো ইয়ান বলেন: “চলচ্চিত্র ও সাহিত্য পরস্পরের ওপর নির্ভর করে। শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম চলচ্চিত্রের ভিত্তি। একথা মানতে হবে যে, গত শতাব্দির আশির দশক থেকে উৎকৃষ্ট উপন্যাস অবলম্বনে চীনে একাধিক আন্তর্জাতিক মানের চলচ্চিত্র তৈরী হয়েছে। তেমনই কোনো এক চীনা চলচ্চিত্র সারা বিশ্বে জনপ্রিয় হলে উপন্যাসের লেখকের সুনাম হবে।”

১৯৮৮ সালে মো ইয়ানের উপন্যাস “স্বর্গে রসুনের অঙ্কুরের গান” লেখক-প্রকাশনালয় থেকে প্রকাশিত হয়। এ বছরের শরতকালে কাও মি শহরে সানতং বিশ্ববিদ্যালয় ও সানতং প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে মো ইয়ানের সাহিত্যসৃষ্টির ওপর একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এ সেমিনারে পাঠ করা প্রবন্ধগুলো পুস্তক আকারে ১৯৯২ সালে সানতং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশনালয় থেকে প্রকাশিত হয়।

১৯৯৩ সালে মো ইয়ানের উপন্যাস “মদ তৈরীর দেশ” ও “তৃণভোজী গোষ্ঠী” যথাক্রমে হুনান প্রদেশের সাহিত্য প্রকাশনালয় ও হুয়া-ই প্রকাশনালয় থেকে প্রকাশিত হয়।

১৯৯৭ সালের উপন্যাস “উন্নত স্তন ও মোটা পাছা”-র জন্য তিনি “কৃতী লেখক পুরস্কার” হিসেবে যে এক লাখ ইউয়ান পান,তা টাকার পরিমাণের দিক থেক চীনের ইতিহাসে রেকর্ড সৃষ্টি করে ।

২০০৯ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রকাশিত মো ইয়ানের উপন্যাস “ব্যাং” স্বতন্ত্র রচনাশৈলিতে রচিত। এ-উপন্যাসের আঙ্গিক চারটা লম্বা চিঠি ও একটা নাটক নিয়ে গঠিত। এতে সাংতং প্রদেশের একটি চিকিত্সালয়ের স্ত্রীরোগ ও প্রসব বিভাগের একজন নারী চিকিত্সকের জীবন বর্ণনায় গত ৬০ বছরে চীনের গ্রামাঞ্চলের জন্মনিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া প্রতিফলিত হয়েছে এবং চীনের বুদ্ধিজীবীদের মনের অসহায়ত্ব ও গ্লানি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

২০১২ সালে মো ইয়ান উপন্যাস “ব্যাং”এর জন্য চীনের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার—মাওতুন সাহিত্য পুরস্কার অর্জন করেন।

মাওতুন সাহিত্য পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে মো ইয়ান বলেন: “অনেকে আমাকে জিজ্ঞাস করেন,আপনি এ উপন্যাস কাদের নিয়ে লিখেছেন? উত্তরে আমি বলি, আমি মানুষের কথা লিখেছি, আমার পিসিমার মত ৫০ বছর ধরে গ্রামের চিকিত্সাকাজে নিয়োজিত একজন নারী চিকিত্সকের অত্যাশ্চর্য জীবনকাহিনী, তাঁর সুখদু:খ ও মিলন-বিচ্ছেদ, তাঁর মনের দ্বন্দ্ব,অতীতের কাজকর্ম সম্বন্ধে তাঁর নতুন বিচার-বিবেচনা ও প্রায়শ্চিত্য, তাঁর মহত্ত্ব ও সহনশীলতা, তাঁর হীনতা ও সংকীর্ণতা,সমসাময়িক সমাজের সাথে তাঁর পেশাগত নীতির বিরোধ ও সামঞ্জস্যের কথা লিখেছি।”

পেইচিং বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত একটি সেমিনারে নিজের সাহিত্যসৃষ্টির অভিজ্ঞতা সম্পর্কে মো ইয়ান বলেন, “একজন লেখক যদি কারো পক্ষে দাঁড়িয়ে উপন্যাস লেখেন, তার উপন্যাস হয়তো সময়িকভাবে প্রশংসিত হতে পারে, কিন্তু ইতিহাসের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে না। কারণ, শ্রেণী হোক, রাজনৈতিক পার্টি হোক, তাদের দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। শুধু মানুষ, মনুষ্যত্ব এবং মানুষের অনুভূতি ও আত্মা নিয়ে লিখলে আপনার লেখা টিকে থাকতে পারে অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ সময়। এ সত্যতা মনে রেখেই আমি ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস লিখেছি এবং লিখব।”

মো ইয়ানের নোবেল সাহিত্য পুরস্কার জয়ের পর একটি সাংবাদিক সম্মেলনে “আপনার লেখার কী গুণ সুইডেনের সাহিত্য একাডেমীর নির্বাচন কমিতির সদস্যদের মনকে আকর্ষণ করেছে?”-এ ধরনের এক প্রশ্নের উত্তরে মো ইয়ান বলেন: “আমি মনে করি,যেটা তাঁদের মুগ্ধ করেছে সেটা প্রধানত: আমার লেখার সাহিত্যিক চরিত্র । এটা একটি সাহিত্য পুরস্কার,তা কাউকে দেয়া হলে নিশ্চয় তার সাহিত্যিক চরিত্র বিবেচনা করতে হবে । আমার লেখা যেমন চীনের সাহিত্যের,তেমনই বিশ্বসাহিত্যের একটি অংশ। আমার লেখায় চীনা জনগণের জীবনযাত্রা ও চীনের স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও রীতিনীতি প্রকাশ পেয়েছে। একই সময় ব্যাপক অর্থে আমার লেখায় মানুষের স্বরূপই তুলে ধরা হয়েছে। আমি সর্বদাই মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়ে মানুষের কথা লিখি। শুধু এ ধরণের লেখাই অঞ্চল, সম্প্রদায় ও জনসমষ্টির সীমা অতিক্রম করতে পারে।”

বিদেশী ভাষায় অনুদিত চীনা লেখকদের রচনাগুলোর মধ্যে বোধ হয় মো ইয়ানের রচনাই পরিমাণে সবচেয়ে বেশী। তারঁ উপন্যাস “লাল সরঘামের বংশ” ইতোমধ্যে ইংরাজি, ফরাসী, জার্মান, ইটালিয়ান, জাপানী, স্পেনিস, হিব্রু, সুইডিস, নরওয়েজিয়ান, ডাচ, কোরিয় ও ভিয়েতনামী ভাষায় অনুদিত হয়েছে। উপন্যাস “উন্নত স্তন ও মোটা পাছা” ইংরাজি, ফরাসী, ইটালিয়ান, জাপানী, ডাচ, কোরিয়, ভিয়েতনামী, স্পেনিস, পোলিস, পর্তুগিজ, সার্বিয়ান ভাষায় অনুদিত হয়েছে। তাঁর উপন্যাস “চন্দন কাঠের মঞ্চে দণ্ড কার্যকরী করা” ভিয়েতনামী, জাপানী ,ইটালিয়ান, কোরিয় ও ফরাসী ভাষায় অনুদিত হয়েছে। উপন্যাস “পরিশ্রান্ত জীবন-মৃত্যু”র অনুবাদগ্রন্থ প্রকাশের জন্য ভিয়েতনাম,জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া,ইটালি,ফ্রান্স, সুইডেন প্রভৃতি দেশের প্রকাশনালয়ের সাথেও চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। তাঁর ছোট গল্প সংকলন ও প্রবন্ধ সংকলনও বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

চীনা ভাষা প্রকাশনালয়ের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের চীনাভাষার পাঠ্যবই বিভাগের সম্পাদক জাং সিয়া ফাং সম্প্রতি সাংবাদিকদের জানান,তিনি এখন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের জন্য ছুটিতে পড়ার উপযোগী বই সম্পাদনা করছেন। এ বইয়ে থাকবে বিদেশের ২০টি রচনা ও চীনের ২০টি রচনা। মো ইয়ানের ছোট গল্প “স্বচ্চ লাল মুলা” এতে স্থান পাবে।

চীনের শিল্পকলা গবেষণাগারের আয়োজিত একটি আলোচনা সভায় চীনের বিখ্যাত পণ্ডিত ইয়ু ছিউ ইয়ু মো ইয়ানের প্রসংশা করে বলেন: “তিন চার বছর আগে,চীনের আধুনিক যুগের লেখকদের মধ্যে কারা বড় বড় পুরস্কার পেতে পারেন?—এ ধরনের প্রশ্নের উত্তরে আমরা যাদের নাম উল্লেখ করতাম মো ইয়ান ব্যতিক্রমহীনভাবে তাঁদের মধ্যে একজন। কারণ তাঁর রচনায় যে মহৎ জীবনবোধ ব্যক্ত করা হয় তা আগেকার সাহিত্যকর্মে খুঁজে পাওয়া যায় না। এ জীবনবোধ সকলের কাছে সহজে গ্রহনযোগ্য বলে আমরা তাঁর জন্মস্থানে না থাকলেও তাঁর লেখা আমাদের মনে প্রবলভাবে সাড়া জাগাতে পারে। আগে যখন চীনের আধুনিক সাহিত্যের কথা যখন বলতাম,তখন মনে হতো,চীনের আধুনিক লেখকদের রচনা ধ্রুপদি সাহিত্যকর্ম বা বিদেশী সাহিত্যকর্মের সমকক্ষ হতে পারে না। মো ইয়ান নোবেল পুরস্কার অর্জন করে চীনের আধুনিক সাহিত্য সম্বন্ধে অনেকের সেই ধারণা বদলাতে পারবেন বলে আমি বিশ্বাস করি।”

 

বিসিসি নিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।


মন্তব্য করুন