মুক্ত আলোচনা

সোমবার | ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ | ৪ পৌষ, ১৪২৪ | ২৯ রবিউল-আউয়াল, ১৪৩৯

প্রচ্ছদ » মতামত » মুক্ত আলোচনা » শিশুর বেড়ে ওঠার প্রতিটি পর্বে তাকে বোঝাতে হবে…

শিশুর বেড়ে ওঠার প্রতিটি পর্বে তাকে বোঝাতে হবে…

শিশুর বেড়ে ওঠার প্রতিটি পর্বে তাকে বোঝাতে হবে…

যাপিত জীবনের সবটা স্বপ্নে ভরা নয়। সবটা সুন্দর আর নির্মলও নয়। চারপাশে ঘটে যায় কত সব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা-দুর্ঘটনা। কখনো তা ইচ্ছাকৃত নির্মমতা, আবার কখনো তা দৈবদুর্বিপাক। আশপাশে ঘটে যাওয়া এসব কষ্টের বিষয় সবার মনেই বিরূপ প্রভাব ফেলে। আর শিশুদের ক্ষেত্রে এই মানসিক আঘাতের প্রভাব অনেক দীর্ঘস্থায়ী ও ক্ষতিকর হয়।
জন্মের আগেই যে শিশুটি মায়ের পেটের মধ্যে গুলিবিদ্ধ হলো—তার মনেও এর প্রভাব থাকতে পারে দীর্ঘদিন। ২০০১ সালে নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ধ্বংসের ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন বা সরাসরি আঘাত পেয়েছেন এমন ১০ হাজার মানুষের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৭০০ জন ছিলেন গর্ভবতী নারী। নিউইয়র্কের মাউন্ট সিনাই মেডিকেল সেন্টারের ট্রমাটিক স্ট্রেস স্টাডিজ বিভাগ এসব নারীর একাংশের ওপর গবেষণা করে দেখে যে এঁদের মধ্যে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার হয়েছে। যেটা দুর্ঘটনার শিকার যে কারও হতে পারে। কিন্তু পর্যায়ক্রমে করা এই গবেষণায় উঠে আসে বিচিত্র সব ফলাফল! ২০০৫, ২০০৯ আর ২০১১ সালে সেসব নারীর সন্তানদের ওপর পরিচালিত পর্যায়ক্রমিক গবেষণায় দেখা যায় সেই শিশুদের মধ্যেও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মানসিক চাপ বা স্ট্রেসের পরিমাণ অন্য সাধারণ শিশুদের (যাদের মায়েরা এ ধরনের কোনো দুর্ঘটনার শিকার হননি) চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। অর্থাৎ মাতৃগর্ভে থাকার সময় যাদের মায়েরা মানসিক আঘাতের শিকার হয়েছিলেন সেই শিশুরা সহজেই মানসিক চাপে ভেঙে পড়ে এবং তাদের মধ্যে অ্যাংজাইটি বা পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার হওয়ার আশঙ্কা বেশি।
মানুষ যখন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্বিপাকের মুখোমুখি হয়, তখন তিন ধাপে এর প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। প্রথম ধাপে, সে বোঝার চেষ্টা করে বিপদটি কী এবং এর মাত্রাই-বা কতটুকু? দ্বিতীয় ধাপে, এই বিপদের ফলে তার শারীরিক ও মানসিক প্রতিক্রিয়া ঘটে; যেমন—দৌড়ে সে পালাতে চায় বা আক্রমণ করতে চায় কিংবা ভয় পায়, রেগে যায় বা কেঁদে ফেলে। তৃতীয় ধাপে, সে তাৎক্ষণিকভাবে বিপদ থেকে বাঁচার চেষ্টা করে। স্মৃতিতে এই অভিজ্ঞতাটি রেখে দেয় পরবর্তী সময়ে সে কীভাবে রক্ষা পাবে সে জন্য। শিশুদের ক্ষেত্রেও তিন ধাপে প্রতিক্রিয়া ঘটে। কিন্তু এর ফলাফল বড়দের চেয়ে আলাদা হয়। কারণ, প্রথম পর্যায়ে সে বিপদের গুরুত্বটাকে হয় খুব বেশি করে দেখে অথবা বুঝতেই পারে না। ফলে দ্বিতীয় ধাপে তার শারীরিক ও মানসিক প্রতিক্রিয়া হয় খুব বেশি বা একেবারে কম। তৃতীয় ধাপে সে বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার মতো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে না। ফলে শিশুর স্মৃতিতে এই অভিজ্ঞতা একটি অস্বাভাবিক গঠন ও মাত্রা নিয়ে দীর্ঘদিন রয়ে যায়। তাই যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় মানসিক আঘাত পাওয়া শিশুর বিকাশ বারবার হোঁচট খেতে থাকে।
শিশুর বয়স অনুযায়ী নির্মমতা, নৃশংসতা আর দুর্যোগের প্রভাব তার ওপর ভিন্ন ভিন্নভাবে পড়ে। খুব ভিড়ের মধ্যে চার-পাঁচ বছরের একটি শিশু হারিয়ে গেল এবং কয়েক ঘণ্টা সে মা-বাবাকে খুঁজে পেল না। এটি তার জন্য অনেক বড় মানসিক আঘাত। কিন্তু ১২-১৩ বছরের শিশুর জন্য এটা হয়তো তেমন কোনো বড় আঘাত নয়। আবার ১২-১৩ বছরের একটি শিশুর চোখের সামনে দুর্ঘটনায় কারও ক্ষতবিক্ষত লাশ দেখাটা অনেক বড় আঘাত। প্রায় সারাজীবন তার মনের ওপর এর প্রভাব থেকে যেতে পারে।
শিশুর মনের ওপর নানাভাবে মানসিক আঘাত আসতে পারে। সে সরাসরি শারীরিক, মানসিক বা যৌন নিগ্রহের শিকার হতে পারে অথবা তার চারপাশে ঘটে যাওয়া নির্মমতা, নৃশংসতা আর দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে মানসিকভাবে আঘাত পেতে পারে। হতে পারে এই আঘাত আকস্মিক ও তীব্র কিন্তু মাত্র একবারই ঘটেছে। যেমন যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়া বা বড় দুর্ঘটনার কবল থেকে মারাত্মক আহত হয়ে বেঁচে ফেরা। এই আকস্মিক-তীব্র মানসিক আঘাত তার পরবর্তী সময়ের জীবনকে বাধাগ্রস্ত করে, আবেগীয় সমস্যায় আক্রান্ত করে ফেলে। আবার মৃদু মানসিক আঘাত প্রতিনিয়ত বারবার হলে; যেমন—স্কুলে প্রতিদিন সহপাঠীর বিদ্রূপের শিকার হওয়া বা বাসায় প্রতিদিন মা-বাবার ঝগড়ার প্রত্যক্ষদর্শী হওয়াও তাকে মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এতে করে বড় হলে অনেকের মধ্যে ব্যক্তিত্বের অস্বাভাবিকতা দেখা যায়, সমাজে মানিয়ে চলতে অসুবিধা হয়।
মানসিক আঘাত পেতে পারে এমন ঘটনার মুখোমুখি হয়েছে এমন শিশুর জন্য শুরু থেকেই বিশেষ যত্ন নেওয়া উচিত। যাতে সে এই আঘাত কাটিয়ে উঠতে পারে। এ জন্য তার দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে, প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। অনেক সময় দেখা যায়, চারপাশের লোকজন দুর্ঘটনার জন্য শিশুটিকেই উল্টো দোষারোপ করছেন, দায়ী করছেন। এমনটা তার মনে আরও বিরূপ প্রভাব ফেলে।
ছোটবেলা থেকেই শিশুর বেড়ে ওঠার প্রতিটি পর্বে তাকে বোঝাতে হবে—সফলতার পাশাপাশি ব্যর্থতাও জীবনের একটি অংশ। দুর্বিপাক আর ব্যর্থতাকে অস্বীকার করে নয় বরং সেগুলোকে অতিক্রম করে কীভাবে বাঁচতে হয় সেটাই শেখাতে হবে প্রতিটি শিশুকে।

অভিভাবকেরা যা করতে পারেন
শিশুদের মনের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে হলে তাকে মানসিক আঘাত থেকে দূরে রাখতে হবে।
*শিশু যাতে শারীরিক, মানসিক বা যৌন নিগ্রহের শিকার না হয় সে জন্য উপযুক্ত সতর্কতা নেওয়া।
*শিশুকে নির্মম ও নৃশংস দৃশ্য, এ রকম চলচ্চিত্র দেখতে নিরুৎসাহিত করা।
*বীভৎস কোনো কিছু প্রত্যক্ষ করা থেকে শিশুকে বিরত রাখা। অনেক সময় দেখা যায় শিশুকে কোলে নিয়ে উৎসুক মা-বাবা রাস্তায় দুর্ঘটনায় আহত বা নিহত লোকজনকে দেখার চেষ্টা করছেন, যা কোনোভাবেই উচিত নয়।
*শিশুর সামনে পারিবারিক কলহ সম্পূর্ণ পরিহার করা।
*শিশু মনে আঘাত পেতে পারে এমন কটুবাক্য দিয়ে তাকে তিরস্কার করা থেকে বিরত থাকা।
*সুন্দর আর নির্মলতার বিপরীতে ক্লেদ আর নির্মমতার যে জগৎ আছে শিশুকে ধাপে ধাপে তার বয়স অনুযায়ী জানানো, যাতে সে কখনো আকস্মিক বা তীব্র মানসিক আঘাত পেলেও মানিয়ে নিতে পারে। কিন্তু যথেষ্ট সংবেদনশীলতার সঙ্গে বিষয়গুলো তাকে জানাতে হবে, যাতে তার মনে আঘাত না লেগে যায়।
লেখক: মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। সহকারী অধ্যাপক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা।
ই–মেইল: soton73@gmail.com

 

বিসিসি নিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

মন্তব্য করুন